February 21, 2026, 1:27 pm
ব্রিটিশ আমলে একজন সাদা চামড়ার সাহেবকে ঝরৎ বলা ছিল বাধ্যতামূলক। তখন আমরা ব্রিটিশদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলাম। ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে ভারত বর্ষের বীর যোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত বিলিয়েছে অকাতরে। ব্রিটিশদের কব্জা থেকে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা হলো। অত:পর শত শত বাঙালি যুবকের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হলো মাতৃভাষা বাংলা। এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা-রক্তপাত-বলিদানের পরেও একজন বাঙালি কর্মকর্তা যদি সেই ঝরৎ সম্বোধন দাবি করেন, তখন আর আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না ঐ কর্মকর্তা মানসিকভাবে এখনো নিজেকে সেই ঔপনিবেশিক প্রভুর স্থলাভিষিক্ত মনে করছেন।
অফিস-আদালতে কর্মকর্তাদের এই ঝরৎ প্রীতি আসলে সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরির চেষ্টা। যখন একজন সাধারণ কৃষক বা শ্রমিক একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ঝরৎ ডাকেন, তখন সেখানে একটি ‘উচু-নীচু’ সম্পর্কের জন্ম হয়। এই দূরত্ব কর্মকর্তার জন্য সুবিধাজনক; কারণ এতে সেবাপ্রার্থীর দাবিটি তখন আর ‘অধিকার’ থাকে না, বরং ‘অনুগ্রহে’ পরিণত হয়। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন সরকারি কর্মকর্তা হলেন জনগণের সেবক, মালিক নন। এই মৌলিক সত্যটি ভুলে যাওয়াই ঝরৎ শোনার আগ্রহের অন্যতম কারণ।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে যে রক্ত ঝরেছিল, তার মূল দাবি ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি। কিন্তু সেই আন্দোলনের মূলে ছিল আরও গভীর এক চেতনার অধিকারবোধ, আত্মসম্মান এবং ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলমুক্তির আকাঙ্খা। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন, দাপ্তরিক ভাষা বাংলা অথচ দেশের অফিস-আদালতে গেলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে।
আমরা ভাষার অধিকার পেয়েছি বটে কিন্তু ‘প্রয়োগের মর্যাদা’ রক্ষা করতে পারিনি। বাংলা ভাষায় ‘জনাব’, ‘মহোদয়’ বা শুদ্ধ সম্বোধন থাকা সত্ত্বেও কেন ইংরেজি ঝরৎ শব্দটির প্রতি এই প্রবল মোহ? কারণ, ইংরেজি শব্দটির সাথে একটি ঐতিহাসিক ‘ভয়’ ও ‘প্রভুত্ব’ জড়িয়ে আছে। বাংলা সম্বোধনে যে আপনত্ব আছে, তা কর্মকর্তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘দূরত্ব’ বজায় রাখতে সাহায্য করে না।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এখনো অনেকখানি সামন্ততান্ত্রিক। এখানে পদবী বা ক্ষমতার জোরে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা বেশি। ধরুন, খুব গরীব ঘরের এক সন্তান কঠোর পরিশ্রম করে বিসিএস বা অন্য কোনো ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিল। তখন রাষ্ট্র কর্তৃক তার চারপাশে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয় যেখানে তাকে সবাই ‘বড় কিছু’ হিসেবে দেখতে চায়। এই সামাজিক চাপ এবং ক্ষমতার মোহ তাকে মোহগ্রস্ত করে ফেলে। ফলে, তিনিও মনে করেন, সাধারণ মানুষ তাকে যথাযথ সম্মান (যা তার দৃষ্টিতে ঝরৎ ডাক) না দিলে তার কঠোর পরিশ্রম সার্থক হচ্ছে না। এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতা, যেখানে আত্মমর্যাদা নির্ভর করে অন্যের আনুগত্যের ওপর।
আমরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি যাতে নিজের ভাষায় নিজের কথা বুক ফুলিয়ে বলতে পারি। কিন্তু যখন একজন বাঙালিকে তার নিজের দেশে, নিজের ভাষায় কথা বলতে গিয়েও ভয়ে ভয়ে ‘স্যার’ সম্বোধন ব্যবহার করতে হয় যাতে ফাইলটি না আটকে যায়, তখন তা বায়ান্নর শহীদদের অপমানের শামিল। ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছিল অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে। কিন্তু বর্তমানের ঝরৎ সংস্কৃতি আমাদের পরোক্ষভাবে মাথা নত করতেই শেখায়।
ফাইলটা আটকে না যায়, এই ভয়ে আমিও ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনো কখনো কাউকে কাউকে ঝরৎ ডাকি। সর্বত্র মাতৃভাষার চর্চা একান্ত জরুরী এবং সেটা উপর থেকে নিচে। সাধারণ জনগণ যদি বুঝতে পারে, ঝরৎ না ডাকলেও তারা বিব্রত হবেন না, ফাইলটা অহেতুক আটকাবে না, ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হবেন না Ñ তবেই ভাষা শহীদদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা পাবে এবং রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিচারপতি থেকেই এই চর্চাটা শুরু করা উচিত।
Leave a Reply