March 9, 2026, 12:26 pm

News Headline :
রপ্তানির আড়ালে লুণ্ঠন আর্থিক খাতের এ রক্তক্ষরণ আর কত?

রপ্তানির আড়ালে লুণ্ঠন আর্থিক খাতের এ রক্তক্ষরণ আর কত?

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন নানামুখী সংকটে জর্জরিত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে উৎকণ্ঠা কাটছে না, তখন নতুন করে রপ্তানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের খবর কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির পিঠে ছুরিকাঘাতের শামিল। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একটি প্রতিষ্ঠানের কথা উঠে এসেছে, ২০২৩ সাল থেকে যার মাধ্যমে প্রায় ৮৭৬ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, নানা ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত আর্থিক খাতের এমন চিত্রের পুনরাবৃত্তি রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ কম দাম দেখিয়ে অর্থাৎ ‘আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের’ মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে সম্পদ গড়ে তোলার এই প্রবণতা প্রমাণ করে দেশের আর্থিক তদারকি ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর ও ছিদ্রযুক্ত। এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মের নেপথ্যে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোও এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঋণের টাকা পুনঃতফসিল করে বা দায় অস্বীকার করে পার পাওয়ার চেষ্টা করলেও ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হওয়া তাদের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার অভাবকেই নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। বলতেই হবে, যাদের জনগণের আমানত রক্ষা এবং দেশের স্বার্থ দেখার কথা ছিল, তাদের এই নির্লিপ্ততা বা পরোক্ষ সহযোগিতা অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ। ফলে রপ্তানি আয়ের মোড়কে এমন ‘ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং’ রোধে শুধু কাগুজে আইন বা মাঝেমধ্যে বিএফআইইউ’র পরিদর্শন প্রতিবেদন যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। একইসঙ্গে আন্ডার ইনভয়েসিং বা পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে এনবিআর, কাস্টমস এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে একটি সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় ‘প্রাইস ভেরিফিকেশন’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করাও এখন সময়ের দাবি। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় দেশে-বিদেশে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে লেনদেন হলে সেগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনতে হবে। যেসব ব্যবসায়ী করোনাকালীন সংকটের অজুহাত দিয়ে বা ব্যাংকের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের দোহাই দিয়ে বিদেশে ডলার আটকে রেখেছেন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে তাদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রিয় হলেও সত্য, আইনের শাসনের অভাব থাকলে লুণ্ঠনকারীরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে, যা সৎ ব্যবসায়ীদেরও নিরুৎসাহিত করবে। মনে রাখতে হবে, দেশের সম্পদ শুষে নিয়ে বিদেশে স্বর্গ গড়ে তোলার এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে না পারলে অর্থনীতির কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বিএফআইইউ’র প্রতিবেদনটি যেহেতু এখন এনবিআর ও দুদকের হাতে রয়েছে, তাই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাচারকারী ব্যক্তির মতো যারা বিদেশে অবৈধভাবে ব্যবসা ও সম্পদ গড়ে তুলেছেন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে সেই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক ও আইনি লড়াই শুরু করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাংক খাতের ভেতরে যেসব অসাধু কর্মকর্তা এই মহোৎসবে সহায়তা করেছেন, তাদেরও জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর বিকল্প নেই। এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে সরকারের অগ্রাধিকার কাম্য।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © All rights reserved © 2024 DailyBiplobiBangladesh.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com