নাগোয়ার আকাশে ছিল মিষ্টি রোদ। করোগি অ্যাথলেটিক পার্কেও ছিল সূর্যের প্রখরতা। গ্যালারির বেশিরভাগ অংশজুড়েই ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। লিটন কুমার দাস–মোস্তাফিজুর রহমানদের সমর্থন জোগাতে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ স্লোগানে প্রকম্পিত করেন দর্শকরা। কিন্তু ক্রিকেটের বাইশ গজে বাংলাদেশ ছড়াতে পারেনি মুগ্ধতা। তাওহিদ হৃদয়ের ব্যাটে চড়ে ১৩ ওভারে ১১১ রানের ইনিংসটি যখন জয়ের জন্য যথেষ্ট মনে হয়েছিল, ঠিক তখনই বল হাতে দলের প্রধান ভরসা মোস্তাফিজুর রহমান করলেন বাজে বোলিং। তার দুই ওভারে আবদুস সামাদ ও হাসান নওয়াজ ৪১ রান নিয়ে ম্যাচের গল্পটাই পাল্টে দেন।
বৃহস্পতিবার এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের প্রথম সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে ৬ উইকেটে হেরে ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়েছেন টাইগাররা। আগামীকাল ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।
পাকিস্তানের এই দলটি ততটা শক্তিশালী নয়। সাইম আইয়ুব ও সাহিবজাদা ফারহান ছাড়া বড় তারকা বলতে খুব একটা কেউ নেই। বিপরীতে তারকাসমৃদ্ধ ও পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে এবারের এশিয়ান গেমসে খেলতে আসে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার ভেজা আউটফিল্ডের কারণে নির্ধারিত সময়ের সোয়া ১ ঘণ্টা পর শুরু হয় খেলা। ওভার কমে দাঁড়ায় ১৩-তে। উইকেট বিবেচনায় নিয়ে টস জিতে ফিল্ডিং নেয় পাকিস্তান। আরাফাত মিনহাসকে তৃতীয় বলে ছক্কা হাঁকানো তানজিদ হাসান তামিম পঞ্চম বলে আউট হয়ে যান। সাহিবজাদা ফারহানের হাতে ধরা পড়েন তিনি।
স্পিননির্ভর পিচে যেখানে দেখেশুনে খেলার কথা, সেখানে সাইম আইয়ুবকে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে বল মিস করেন লিটন কুমার দাস। দলকে বিপদে ফেলে পরিষ্কার বোল্ড হয়ে যান বাংলাদেশ অধিনায়ক। দলীয় ২০ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে পড়ে যায় বাংলাদেশ। উইকেট থেকে স্পিনাররা যথেষ্ট টার্ন পাচ্ছিলেন। এমন উইকেটে দরকার ছিল হিসাবি (ক্যালকুলেটিভ) ব্যাটিংয়ের। হাতে উইকেট রেখে সিঙ্গেল নেওয়ার সঙ্গে আলগা বলে বাউন্ডারি মারার পরিকল্পনা হওয়ার কথা। সেটা না করে শুরু থেকেই আগ্রাসী হতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। লিটন আউট হওয়ার পর নতুন ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে নামা পারভেজ হোসেন ইমনও পারেননি উইকেটে থিতু হতে। আরাফাত মিনহাসের বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে মোহাম্মদ ওয়াসিমের হাতে ধরা পড়েন তিনি। চার ওভারের পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ৩ উইকেটে ২৭ রান। ভালো ব্যাট করছিলেন সাইফ হাসান। দুটি ছক্কাও হাঁকান তিনি। কিন্তু নতুন বোলার সুফিয়ান মুকিমের বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়া সাইফ করেন ১৭ বলে ১৯ রান।
বাংলাদেশের রানের চাকা সচল রাখেন তাওহিদ হৃদয়। মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে ৫২ রানের জুটি গড়েন তিনি। সুফিয়ানের বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে আউট হন হৃদয়। ২৫ বলে ৪২ রান করা হৃদয়ের ইনিংসটি সাজানো ছিল ২টি চার ও ৪টি ছক্কার সৌজন্যে। অন্য প্রান্তে মোসাদ্দেক মন্থর ব্যাটিং করতে থাকেন। ১৬ বলে ১১ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। শেষের ব্যাটাররা ব্যাট হাতে ঝড় তুলতে পারেননি। ১৩ ওভারে ৭ উইকেটে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ১১১ রান।
বোলিংবান্ধব এই উইকেটে রান করাটা কঠিন ছিল। হঠাৎ করে বল লাফিয়ে উঠছিল। এমন উইকেটে বাংলাদেশের স্পিনাররা দারুণ শুরু করেন। ব্যাট হাতে ঝড় তোলার আগেই বিপজ্জনক ব্যাটার সাহিবজাদা ফারহানকে আউট করেন শেখ মেহেদী। অন্য প্রান্তে ঝোড়ো সূচনা করা মাজ সাদাকাতকে আউট করেন নাসুম আহমেদ। ৭ বলে ১৫ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। বাংলাদেশের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান সাইম আইয়ুব। পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে মোস্তাফিজের বলে দুটি ছক্কা ও একটি বাউন্ডারি হাঁকান আইয়ুব। শেষ পর্যন্ত মোস্তাফিজের করা ওভারের শেষ বলেই তানজিদ হাসান তামিমের হাতে ধরা পড়েন আইয়ুব। আউট হওয়ার আগে করেন ১২ বলে ২১ রান। ওই ওভারে মোস্তাফিজ দেন ১৮ রান।
৫৩ রানে ৪ উইকেট হারানো পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের স্বপ্ন দেখতে থাকে বাংলাদেশ। কিন্তু পঞ্চম উইকেটে হাসান নওয়াজ ও আবদুস সামাদ ম্যাচের চিত্রনাট্য বদলে দেন। দুজনেই মারমুখী ব্যাটিং করতে থাকেন। বিশেষ করে সামাদ ছিলেন বিপজ্জনক। বাংলাদেশের পেসার আর স্পিনাররা এ দুই ব্যাটারের বিপক্ষে কিছুই করতে পারেননি। সবাই তাকিয়ে ছিল মোস্তাফিজের দিকে। কিন্তু বাঁহাতি এ পেসার ইনিংসের দশম ওভারে দেন ২৩ রান। তার ওই ওভারেই শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের জয়ের আশা। ১ উইকেট পেলেও ২ ওভারে মোস্তাফিজ দেন ৪১ রান। ৯ বল হাতে রেখে ৪ উইকেট হারিয়ে জয় নিশ্চিত করে পাকিস্তান। সামাদ ৩০ ও নওয়াজ ২৭ রানে অপরাজিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে শেখ মেহেদী, নাসুম, রিশাদ ও মোস্তাফিজ নেন ১টি করে উইকেট।