February 21, 2026, 1:27 pm
কমল সেনগুপ্ত।। আজ অমর একুশে। আন্দোলনটা বাংলা ভাষার জন্য। লড়াই মাতৃভাষার জন্য। দাবি ছিল একটাই পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক। সে আন্দোলনে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে প্রাণ হারিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহকয়েক জন। মাতৃভাষার জন্য সেই লড়াইয়ে জয়ী হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। সেই ভাষা আন্দোলনের জন্যই একুশে ‘অমর’। ২০০০ সাল থেকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে গোটা বিশ্ব ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। আজ একুশের শহীদেরা বিশ্বের প্রতিটি বর্ণমালার পাহারাদার। আর তাঁদের উত্তরসূরিরা বাংলা অক্ষরের লালনকারী।
আমরাই একমাত্র জাতি, যারা মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছি। সেই ১৯৫২! সেই একুশ ফেব্রুয়ারি! আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো। বুক খালি হয়ে যাওয়া মায়েরা। সেই থেকে একুশের ভোর মানেই নগ্নপায়ে শহীদ মিনার অভিমুখে যাত্রা আমাদের। আমরা জানি প্রভাতফেরী বলে। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে সর্বস্তরের মানুষ খালি পায়ে প্রভাতফেরীতে অংশগ্রহণ করেন এবং শহীদ মিনারে গিয়ে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। সারাদিন মানুষ শোকের চিহ্নস্বরূপ কালো ব্যাজ ধারণ করেন।
সেই একুশ। প্রভাত ফেরীর একুশ। আজ সেই ভোরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—কোথায় গেল ফুলচুরি? কোথায় হারাল প্রভাতফেরীর সেই ছন্দময় পদধ্বনি? একসময় ফুলচুরি মানে ছিল ভালোবাসার তাড়না—রাতের অন্ধকারে বাগান থেকে গোপনে তোলা গাঁদা, রজনীগন্ধা, টগর। মা রাগ করলেও চোখে থাকত গর্বের হাসি। কারণ সেই ফুল যেত ভাষাশহীদদের পায়ে। আজ ফুল কেনা হয়, ছবি তোলা হয়, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট হয়—কিন্তু হৃদয়ের গোপন উত্তেজনা কোথায়? কতোই না প্রস্তুতি, কতো আয়োজন । বেড়ে ওঠা এই বরিশালের। আশির দশকের শেষ দিকে যারা স্কুলের ছাত্র বা নব্বইয়ের দশকে কলেজে উঠেছে তাদের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারীর আমেজটা ছিল একবারেই আলাদা । বাড়ির আঙ্গিনায় ফুলের বাগান করার চল ছিল। সেই বাগানে নানা রঙের গোলাপ, ডালিয়া, রজনীগন্ধাসহ নানা ফুল ফুটত। একুশের রাত মানে নির্ঘুম রাত, চেতনার রাত। দল বেঁধে বড়দের সাথে ফুলচুরি। পরদিন সকালে যে ফুল নিয়ে সবাই শহীদ মিনারে যাবে । আর সেজন্য সবাই নিজের বাড়ির ফুল রেখে যেতো অন্যের বাগানে ফুল চুরি করতে। সেই সময়ের যুবকদের ফুল চুড়ির অনেক মজাদার স্মৃতি আছে। বিএম কলেজের বাগানের ফুল চুড়ির স্মৃতি খুব মনে পরে। সেই চুরি করা নানা বাহারি ফুল আর পাতাবাহারের পাতা দিয়ে নিজেরাই বানাতাম ফুলের তোড়া । সেই তোড়া সুতো দিয়ে বেধে নানা রঙের গোলাপ, ডালিয়া, পপি কিংবা চন্দ্র মল্লিকা দিয়ে সাজানো হতো। যত্নে লালন করা ফুলগুলো থেকে সুন্দর আর বড় ফুল ছিড়ে নিয়ে যাওয়া হতো শহীদ মিনারে । পুব আকাশে আলো ফোঁটার আগেই কানে আসত, ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি”। দলে দলে প্রভাতফেরী দল, মাইকে একুশের গান, সুরে সুরে পা মেলান। গন্তব্য শহীদ মিনার। তখন ছিল পাড়ায় পাড়ায় শহীদ মিনার। মা-বাবারা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকত। উৎসাহ দিত একুশের চেতনা জাগাতে। সে এক আবেগের একুশ। আর হয়ত ফিরবে না সারাদিন নগ্ন পায়ের একুশ, সেই ফুল চুরির একুশ।
তবুও বরিশালে একুশ আসে আব্দুল গাফফার চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল লতিফের গানের চেতনায়। বর্ণমালার ছন্দে, পাঠশালার পন্ডিত মশাইয়ের সুরে, সড়কে আল্পনায়, দেয়ালে বর্ণমালায়, গাছ চুরির মামলার আসামীদের নির্মিত শহীদ মিনারে।
Leave a Reply