April 23, 2026, 5:24 pm

বরিশাল জনপদে নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে এইচআইভি

বিশেষ প্রতিবেদক ॥
বরিশাল জনপদে নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে এইচআইভি ভাইরাস। তৈরি করছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময় মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বরিশাল বিভাগ। ইতোমধ্যে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এই বিভাগটি। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শনাক্তের হার বাড়তে থাকায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টারের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ১৩০ জন এইচআইভি পরীক্ষা করিয়েছেন। এর মধ্যে ২০ জনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ১৬০ জনের পরীক্ষা করা হলে ১১ জনের শরীরে এইচআইভি পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে গত এক বছরে মোট ৩১ জন শনাক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ২০ জনই শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তিনজন প্রবাসী, স্থানীয় বিভিন্ন পেশার ছয়জন, একজন সমকামী ব্যক্তির স্ত্রী এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের রয়েছেন। এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর জসিম উদ্দিন জানান, আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই এইচএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী। বয়স ১৭ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বরিশালে এসে পড়াশোনা বা বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘অনেকেই প্রথমে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে চিকিৎসকের কাছে যান। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এইচআইভি শনাক্ত হয়।’ চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্তদের বড় অংশের ক্ষেত্রে প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন জ্বর বা মাথাব্যথা, রক্তস্বল্পতা এবং দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিসার ডা. মাশরুর বিন আজাদ বলেন, ‘নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে, যা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বাড়ছে, যা সংক্রমণের বিস্তার ঘটাতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে এবং নিয়মিত ওষুধ ও ফলোআপ নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে সমস্যা হলো, অনেক সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি এখনো পরীক্ষা করাতে আসছেন না–এটি উদ্বেগজনক। ঢাকা আহসানিয়া মিশনের বরিশাল অঞ্চলের ম্যানেজার মশিউর রহমান অপু বলেন, ‘সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ানোর প্রধান কারণ। অনেকেই লজ্জা বা ভয়ের কারণে পরীক্ষা করাতে চান না।’ তিনি আরও বলেন, এইচআইভি প্রতিরোধে নিয়মিত পরীক্ষা, নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা জরুরি। আক্রান্তদের প্রতি সহমর্মিতা বজায় রেখে সচেতনতা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেন। সরকারি বিএম কলেজের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মুহা. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘তরুণদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। পারিবারিক নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়েছে, সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী সামাজিক প্রস্তুতি তৈরি হয়নি। ফলে তারা সহজেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা অনেক সময় একসঙ্গে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। তাদের চলাফেরা ও জীবনযাপন সম্পর্কে অভিভাবকদের আরও সচেতন থাকা প্রয়োজন। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, ‘এইচআইভি শুধু একটি রোগ নয়, এটি একটি সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © All rights reserved © 2024 DailyBiplobiBangladesh.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com