February 23, 2026, 4:47 pm
বিপ্লবী ডেস্ক ॥ ভোলায় অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের অবাধ বিস্তারে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা। মানহীন চিকিৎসা সেবা, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভুয়া সনদ ব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে জেলার বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রসূতি মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিছু ল্যাবরেটরিতে অনুমোদন না থাকলেও নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আবার অনেক ক্লিনিক ও হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি ছাড়াই রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী রোগী ভর্তি করতে হলে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ও ডিপ্লোমাধারী নার্স থাকা বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্লিনিকে আয়া দিয়ে নার্সের কাজ করানো হচ্ছে এবং ভুয়া সনদ ব্যবহার করে সিনিয়র নার্স পরিচয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েকদিনে শহরের চারটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রসূতি মা ও নবজাতকসহ অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ভুল চিকিৎসা, অদক্ষ ও নন-ডিপ্লোমা নার্স, ভুয়া ডাক্তার এবং ক্লিনিক মালিকদের অবহেলাকে এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী করছেন তারা। এ ধরনের ঘটনার পরও দৃশ্যমান কোনো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে। মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হলেও তা দায়সারা পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— অদৃশ্য কোনো প্রভাব কি প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? এ বিষয়ে ভোলা জেলার সিভিল সার্জন জানান, অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি “জয়নাল আবেদন মেডিকেল সার্ভিস” নামে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার কাগজপত্রে গরমিল ও অনিয়মের কারণে সিলগালা করা হয়েছে। যেসব ক্লিনিকে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর তদন্ত চলছে এবং তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অদক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে ল্যাব টেস্ট করানো হচ্ছে এবং অনুমানের ভিত্তিতে রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মানসম্মত যন্ত্রপাতিরও ঘাটতি রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। অভিযোগ আছে, অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এমনকি সিজারিয়ান অপারেশনে ব্যবহৃত সরঞ্জাম যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না করা এবং এক রোগীর ব্যবহৃত সামগ্রী অন্য রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি একটি ক্লিনিকে ডোনারের রক্ত ক্রস-ম্যাচিং ছাড়া রোগীর শরীরে প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া দালাল চক্রের মাধ্যমে কমিশনভিত্তিক রোগী সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভে অসহায় রোগীদের মানহীন ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যার ফলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। ভোলা ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সদস্য মোঃ এরশাদুল ইসলাম আজাদ বলেন, জেলায় অনেক মানসম্পন্ন ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক রয়েছে, যারা শতভাগ সঠিক রিপোর্ট ও সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো জেলার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ভোলার প্রেক্ষাপটে রেজিস্টার্ড ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স পাওয়া কঠিন হলেও যথাযথ সম্মানী দিলে দক্ষ জনবল পাওয়া সম্ভব। বদলি বাণিজ্যের কারণেও ডাক্তার ও নার্স দীর্ঘদিন স্থায়ী হন না বলে তিনি দাবি করেন। সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম ও মানহীন সেবা অব্যাহত থাকলে মানুষের আস্থা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। তারা দ্রুত তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধ ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply