April 23, 2026, 5:25 pm
স্টাফ রিপোর্টার ॥
সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বাসভাড়া না বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না। ঢাকা-বরিশাল রুটে ইতিমধ্যে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বাসে অপর দিকে বরিশাল-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চের ভাড়া ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এই রুটের যাত্রীরা। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেলে নথুল্লাবাদে শ্যামলী পরিবহনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫৫০ টাকার স্থলে ৬০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। একই তথ্য জানা গেছে হানিফ ও সাকুরা পরিবহনের ক্ষেত্রে। শফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, সব সময় ৫৫০ টাকায় তিনি ঢাকা যান। কিন্তু হঠাৎ ঢাকার ভাড়া ৬০০ টাকা করেছে। ৫০ টাকা করে প্রত্যেকের কাছ থেকে বেশি নেওয়া হচ্ছে। আসমা আক্তার নামক এক গৃহিণী সন্ধ্যায় জানালেন, তাঁর কাছ থেকে শ্যামলী পরিবহনে ৬০০ টাকা ভাড়া নিয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বৃদ্ধির কথা বলেছে কাউন্টার থেকে। এ প্রসঙ্গে বরিশাল জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, ‘৫৫০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হতো। এখন কেন ৫০ টাকা বাড়িয়েছে, তা বলতে পাড়ছি না।’ তিনি বলেন, ‘পরিবহনমালিকেরা এটা বলতে পারবেন।’ এদিকে সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বাসভাড়া না বাড়ানোর জন্য দেশের সব পরিবহনমালিকদের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম এই নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, সরকারিভাবে বাসভাড়া বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া যাবে না। বরিশাল-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চের ভাড়া ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। গত সোমবার (২০ এপ্রিল) থেকে যাত্রীদের কাছ থেকে বর্ধিত ভাড়া আদায় করছেন তারা। লঞ্চ মালিক, কর্মচারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলের দাম বাড়ার আগে লঞ্চের ডেকের ভাড়া ছিল ৩০০ টাকা, গত সোমবার থেকে ৩৫০ টাকা করে যাত্রীদের কাছ থেকে নিচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। একইভাবে সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ছিল এক হাজার টাকা, তা ২০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা নিচ্ছেন। ডাবল কেবিনের ভাড়া ছিল ২ হাজার টাকা। বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। এভাবে ফ্যামিলি ও সৌখিন কেবিন থেকে শুরু করে সেমি-ভিআইপি ও ভিআইপি কেবিনের ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগে এভাবে ভাড়া আদায় করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। বরিশাল থেকে ঢাকাগামী সুন্দরবন লঞ্চের ডেকের যাত্রী আব্দুস সবুর বলেন, ‘এটা তো এদেশের নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই ৩৫০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আমরাও দিতে বাধ্য হচ্ছি। রাজনৈতিক নেতা বলেন আর সরকার, কেউ দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না। একসঙ্গে এত টাকা তেলের লিটারে বাড়িয়ে দিলো, যার পুরো চাপ পড়ছে মানুষের ওপর। আগে ডেকের ভাড়া ৩০০ টাকা নেওয়া হতো, তাতেও লঞ্চ মালিকদের লাভ হতো। এখন তেলের দাম বাড়ায় আমাদের মাথায় অতিরিক্ত ভাড়া তুলে দিলো। এসব কথা বলেও কোনও লাভ নেই। কারণ ভাড়া তো আর কমাতে পারবে না সরকার।’ একই কষ্টের কথা বললেন ডেকের যাত্রী রহিম শেখ, রাজ্জাক মৃধা, মনোজসহ একাধিক যাত্রী। তারা জানিয়েছেন, ডেকে আমাদের মতো সাধারণ লোকজন যাতায়াত করে। ৫০ টাকা অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। লঞ্চের কেবিনের যাত্রী ঢাকার ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সড়কের চেয়ে নিরাপদ যাত্রা হওয়ায় লঞ্চে ঢাকা-বরিশাল যাতায়াত করে থাকি। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর এক হাজার টাকা করে সিঙ্গেল এবং দুই হাজার টাকায় ডাবল কেবিনে যাতায়াত করতাম। মঙ্গলবার রাতে ফ্যামিলিসহ ঢাকায় যেতে ডাবল কেবিনের ভাড়া নিয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। কারণ জানতে চাইনি। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভাড়া বেশি গুনতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। বাড়তি চাপ পড়ছে আমাদের ওপর। কারণ সব কিছুরই দাম বেড়ে গেছে।’ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুরভী লঞ্চের মালিক এবং কেন্দ্রীয় লঞ্চ মালিক সমিতির সাবেক সহসভাপতি রেজিন উল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের পূর্ব নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক কম নেওয়া হচ্ছে। ডেকের ভাড়া ৫০ আর কেবিনে যে ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে, তা পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম। গত রবিবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নৌপথে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়াতে সরকারকে চিঠি দিয়েছেন লঞ্চমালিকরা। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে মালিকপক্ষের। ওই বৈঠকে পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও আরও বাড়বে। তা অবশ্যই ডেকে ৫০ ও কেবিনে ২০০ টাকার বেশি হবে।’ প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন দাম গত রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। এই চাপ পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রায়। লঞ্চ মালিকদের সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বদিউজ্জামান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। এর ফলে লঞ্চ পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে প্লেট, এল, প্রপেলার, ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ, ফুয়েলিং রড, গ্যাস, রং ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। লঞ্চমালিকদের প্রস্তাব অনুযায়ী, যাত্রীভাড়া ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে বর্তমান ১ টাকা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৩৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া সর্বনিম্ন যাত্রীভাড়া ২৯ টাকার পরিবর্তে ৩৫ টাকা নির্ধারণের অনুরোধ করা হয়েছে।
Leave a Reply