রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ন
Logo

ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক খানাখন্দে ভরা ২০৫ কিমি শেষ নেই ভোগান্তির

প্রতিবেদকের নাম / ১ সময় দৃশ্য
আপডেট: রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকেই শুরু হয়েছে ভাঙাচোরা রাস্তা। ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য ২০৫ কিলোমিটার। সমুদ্র সৈকতে যেতে উঁচুনিচু আর খানাখন্দে ভরা এই পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয়।

মহাসড়কটি দিয়ে কেবল কুয়াকাটা আর পায়রা সমুদ্র বন্দরই নয়, রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের ৯ জেলার লাখ লাখ মানুষ। কাগজে-কলমে মহাসড়কের মর্যাদা পেলেও বাস্তবে সড়কটি রয়ে গেছে সংযোগ সড়কের চেহারায়। ১০ বছর আগে এটিকে ছয় লেন করার ঘোষণা দিয়েছিল তৎকালীন সরকার।

২০১৮ সালে ঢাকঢোল পিটিয়ে জমি অধিগ্রহণও শুরু হয়। কিন্তু টানা আট বছরেও তা শেষ হয়নি। বর্তমানে যে দুর্দশা, তাতে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়কটি। গর্ত আর খানাখন্দের কারণে পৌনে চার ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লেগে যাচ্ছে ৭-৮ ঘণ্টা। সেই সঙ্গে প্রায়ই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। হতাহত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ।

ভাঙাচোরা সড়কে অসহনীয় দুর্ভোগ : ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত দূরত্ব ৮২ কিলোমিটার। ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে ধরে এই পথটুকু পাড়ি দিতে সময় লাগে এক ঘণ্টারও কম। এরপর থেকেই শুরু দুর্ভোগ। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর যে সড়কে প্রতি ঘণ্টায় চলে কয়েক হাজার গাড়ি, সেই সড়কটির প্রস্থ এখনো ২৪-৩০ ফুট। সরু এই সড়কে চলতে গিয়ে নিত্য দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ।

ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ৯৭ কিলোমিটার সড়ক খানিকটা প্রশস্ত হলেও বরিশালের পর থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১০৭ কিলোমিটার মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত। এ কারণে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। এর সঙ্গে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো যোগ হয়েছে গর্ত-খানাখন্দ।

ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা ও পটুয়াখালী সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সড়কের বহু জায়গায় উঠে গেছে পিচের ঢালাই। কোথাও কোথাও বেরিয়ে পড়েছে ইটের সোলিং। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে অসংখ্য গর্ত আর খানাখন্দ। বরিশাল সড়ক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান খান বলেন, ‘সমস্যাটা আসলে গোড়ায়। প্রকৌশলগতভাবে একটি সড়ক যেভাবে নির্মাণ হয়, এই সড়কটির ক্ষেত্রে তা হয়নি। প্রতি বছর বর্ষায় সৃষ্টি হয় খানাখন্দ।’

সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের ওই ২০৫ কিলোমিটার সড়কের অন্তত ১৮৩টি পয়েন্টে সৃষ্টি হয়েছে গর্ত ও খানাখন্দ। সড়কজুড়ে ভাঙাচোরা অবস্থা। এই রুটে বাসে নিয়মিত ঢাকা-কুয়াকাটা যাতায়াত করা পটুয়াখালীর বাসিন্দা জলিল হাওলাদার বলেন, ‘ভাঙ্গার পর থেকে বাস এতোটা ঝাকি খায়, সিটে বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।’ ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে চলাচলকারী বাস শ্যামলী পরিবহণের চালক আল আমিন সিকদার বলেন, ‘রাস্তার অবস্থা এতো খারাপ, ৩-৪ রাউন্ড ট্রিপ দেওয়ার পর বাসের স্প্রিংসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ পালটাতে হয়।’

বরিশাল সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, ‘বরিশালের দপদপিয়া থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার ও প্রশস্তকরণে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। শুকনো মৌসুমে এই কাজ শেষ হলে বরিশাল অংশে ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। তবে প্রকৌশলগত পদ্ধতিতে পুরো সড়কটি নতুনভাবে নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সমস্যা বারবার ফিরে আসবে।’

সরু সড়কে মৃত্যুর মিছিল, অধরা ছয় লেনের স্বপ্ন : পদ্মা সেতু চালু হলে ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ার আভাস আগেই দিয়েছিল সড়ক ও জনপথ বিভাগ। সেই আভাস যে সমীক্ষার সব হিসাব ছাড়িয়ে যাবে, তা হয়তো তখন বুঝতে পারেনি কেউ। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে ভাঙ্গা-কুয়াকাটা সড়কে দৈনিক চলাচল করত ১৭-১৯ হাজার যানবাহন। চলতি বছরের জুনে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৩৫-৪০ হাজারে। বিপুলসংখ্যক এই যানবাহনকে চলতে হচ্ছে পুরোনো সেই ২৪-৩০ ফুট চওড়া সড়কে। এ কারণে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৮৩টি দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ। বাংলাদেশ রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, এখনো ছয় লেন না হওয়ার কারণেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে শত শত মানুষ।

সওজের বরিশাল দপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফজলে রব্বে বলেন, ‘মাদারীপুর অংশের জমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ফরিদপুর ও বরিশাল থেকে লেবুখালী পায়রা ব্রিজ পর্যন্ত অধিগ্রহণ চলছে। পায়রা ব্রিজ থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। তাছাড়া সরু সড়কের দুর্ভোগ কমাতে ফরিদপুর থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কটি ৩৪ ফুট প্রশস্ত করার কাজ চলছে। এটি শেষ হলে কিছুটা হলেও কমবে দুর্ভোগ।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এবায়েদুল হক চান বলেন, ‘আমাদের অন্যতম প্রধান দুঃখ এখন এই ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা সড়ক। এটি ছয় লেন না হওয়া পর্যন্ত সড়কে গতি যেমন বাড়বে না, তেমনি অপার সম্ভাবনা থাকা সত্তেও শিল্পায়নে সমৃদ্ধ হবে না বরিশাল বিভাগ।’

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com