সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন
Logo
সর্বশেষ:
বরিশালের ট্রাফিক সিগন্যাল, অচল ৩ দশক ধরে! বৈরী আবহাওয়ায় থমকে আছে সাগরযাত্রা, দুশ্চিন্তায় জেলেরা শেবাচিম হাসপাতাল, ‎যেখানে বেশি প্রয়োজন সহমর্মিতা আর ভালোবাসার বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর তীরে পাইরোলাইসিস কারখানা, ৭ দিনের মধ্যে বন্ধে বেলার আইনি নোটিশ বরিশালে নদীতে মিলল অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ বরিশালে বেডরুমের এসি থেকে উদ্ধার চারটি কালনাগিনী সাপ মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবারকেও ধ্বংস করে-গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী সোহেল মনজুর নিখোঁজের দুই দিন পর সমুদ্রে মিলল ভাসমান জেলের লা*শ বোরহানউদ্দিনে অবৈধ ড্রেজার, বাল্কহেডসহ আটক ১৫ বরগুনা জেলেদের চাল আত্মসাত ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা

শেবাচিম হাসপাতাল, ‎যেখানে বেশি প্রয়োজন সহমর্মিতা আর ভালোবাসার

প্রতিবেদকের নাম / ২৩ সময় দৃশ্য
আপডেট: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
ফটোকার্ড- বিপ্লবী বাংলাদেশ
ফটোকার্ড- বিপ্লবী বাংলাদেশ

‎‎॥ রিচার্ড দিগন্ত ঘরামী ॥

নদী আর খালের শহর হিসেবে পরিচিত বরিশাল বিভাগ। চন্দ্রদীপ থেকে বাকলা আর সবশেষ পরিচিতি বরিশাল। এই পরিচয়ে ডিজিটাল যুগে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে সব ক্ষেত্রেই। তবে চিকিৎসা খাতে যেন আলোর মুখ দেখছে না। দখিনের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতাল। ‎১৯৬৮ সালের ২০ নভেম্বর এর যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে কাগজে কলমে হাসপাতালটি ১২’শ শয্যার হলেও প্রতিদিন সেবা দিতে হয় ২৫‘শ রোগীকে। ফলে রোগীর স্বজন আর হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের সাথে প্রায়শই ঘটে বাকবিতন্ডা আর হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা।
তেমনই আমার পরিবারে সাথে ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তাহলে বলি, ‘চলতি বছরের মার্চ মাসে গোটা দেশ জুড়েই প্রকোপ বাড়ে হাম সংক্রমনের। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমার বোনের ৯ বছরের মেয়ে নিউ জোসিফিন বিশ্বাসকে ভর্তি করেছিলাম হাম উপসর্গ নিয়ে। তখন বিছানা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। সেখানেও সমস্যা ছিলো না। হাসপাতালটির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ প্রতিনিয়ত জোসিফিন এর অসুস্থতা বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। অগ্যতা বাধ্য হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়ে পাড়ি জমাতে হয় ঢাকা মেডিকেলে।’

‎হাসপাতালটির আরেকটি ঘটনা বলি, ‘২০২৩ সালের শেষের দিকে বাকেরগঞ্জের পাদ্রীশিবপুর থেকে আমার এক দুর সর্ম্পকের আত্মীয় চল্লিশ কি পয়তাল্লিশ বছর বয়স হবে। নাম মিল্টন হালদার। তিনি এসেছিলেন দূর্ঘটনায় আঘাত পাওয়া বা-হাতের ব্যাথা নিয়ে। দীর্ঘ লাইনের পর হাসপাতালের আউটডোরের চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পান তিনি। চিকিৎসক তাকে কিছু পরীক্ষা দেন। এরপরই মূলত ঘটে অপ্রীতিকর ঘটনা। তার হাতে থাকা মেডিকেল ব্যবস্থাপত্রটি টেনে নিয়ে যায় ২৫ কি ২৬ বছরের একটি ব্যাক্তি। পরিচয় দেন তিনি হাসপাতালের সামনের বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মী (মার্কেটিং অফিসার)। মিল্টনকে বলেন, অল্প খরচে তাদের সেই প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি এক্স-রে করাতে পারবেন। ওই বিপণন কর্মী পরিচয় দেয়া ব্যাক্তির জোরাজুরিয়ে তিনি বাধ্য হয়ে সেখানে যান। এবং সেই এক্স-রে করাতে তাকে ৪‘শ টাকার কথা বল্লেও তার থেকে নেয়া হয় ১৩‘শ টাকা। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় এক পর্যায়ে তাকে লাঞ্চিতও হতে হয়।’

‎আর পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়শই খবরের শিরোনামে উঠে আসে হাসপাতালটিতে রোগীর স্বজন এবং চিকিৎসকদের সাথে বাক-বিতন্ডা আর হামলার ঘটনা। চলতি বছরের ২০ মে মধ্য রাতে জাতীয় একটি দৈনিকের অনলাইনের একটি সংবাদ অজান্তেই চোখের পানি এনে দিয়েছিলো। সংবাদটি ছিলো ‘নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের তুলকালাম ঘটেছে। এ ঘটনায় মৃত নবজাতকের এক স্বজনসহ দুইজনকে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক মারধর করে আটকে রাখেন। পরে হাসপাতাল পরিচালক, মেডিকেল কলেজ প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ক্ষমা চেয়ে ও মুচলেকা দিয়ে রক্ষা পান আটক থাকা দুই ব্যক্তি।’

‎প্রায়শই অনাকাক্ষিত ঘটনা আর সেবার মান বাড়াতে ২০২৪ সালের গণঅভ্যূত্থানের পর এ অঞ্চলের মানুষের দাবী উঠে সেনাবাহিনীতে কর্মরত কাউকে এই হাসপালের পরিচালক পদে দায়িত্ব দেয়ার। তৎকালীন অর্ন্তবর্তী সরকার বিষয়টি আমলে নিয়ে ওই বছরের ২৫ নভেম্বর হাসপাতালটির পরিচালক পদে দায়িত্ব দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ. কে. এম. মশিউল মুনীর।

‎তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর হাসপাতালটিতে আধুনিক ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ, হেমাটোলজি ল্যাবরেটরি বিভাগ চালু এবং পুরো প্রক্রিয়াটি অটোমেশনের আওতায় এনেছেন। রোগীদের দুর্ভোগ লাঘবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) চালু করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম দূর করে সরকারি বরাদ্দের শতভাগ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। পাশাপাশি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি দূর করে চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছেন।

‎তবে এই পরিচালক দায়িত্ব নেয়ার পর হাসপাতালটির অনিয়ম ও অব্যস্থাপনা রোধে নানা পদক্ষেপ নেয়। তবে এর পরপরই হঠাৎ করেই দেখা দিয়েছে ঘন ঘন অগ্নিকান্ডের ঘটনা। রহস্যজনক অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বাড়ে। গঠিত হয় তদন্ত কমিটিও। যে বিষয়ে আশাহত হয়েছি, তা হলো অগ্নিকান্ডের কারণগুলো অদৃশ্য থেকে যাওয়া নিয়ে।

‎হাসপাতালটির সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একদিন চায়ের আড্ডায় কথা হয়েছিলো একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এডওয়ার্ড রিয়াজ মাহমুদের সাথে। ‘বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি উইলিয়াম শেকসপিয়র-এর একটি অমর বাণী “ওষুধের চেয়েও ভালোলাগা ও সহমর্মিতা অনেক সময় বড় অসুখ সারিয়ে তুলতে পারে” উল্লেখ করে বলেছিলেন, আমরা নিজেরাই পারি সব অন্যায় আর অনিয়ম দূর করতে। সেখানে প্রয়োজন একটু মনখোলা ভালোবাসা। শুধু ভালোবাসাই নয়, তারও মনে-প্রাণে একটাই চাওয়া সব ক্ষেত্রের মতো বরিশালের চিকিৎসা খাতও একদিন মাথা উচু করে দাড়াঁবে।’

‎তবে আমার হৃদয়ের কথা, নদী-নালা আর খালের কলতানে যে বরিশালের বুক জুড়ে চিরকাল শান্তির সুবাতাস বয়েছে, সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনের শেষ ভরসাস্থল শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যেখানে মানুষ আসে রোগমুক্তির নিশ্বাস নিতে, সেখানে কখনো নোংরা পরিবেশের দমবন্ধ করা গ্লানি, কখনো দালাল চক্রের নিষ্ঠুর প্রতারণা, আবার কখনো বা অনাকাক্সিক্ষত সংঘাতের ক্ষত নিয়ে ফিরতে হয়। ‘জোসিফিন বিশ্বাস’ এর মেঝের ধুলোয় কাটানো কষ্ট কিংবা মিল্টন হালদার সেই অসহায় লাঞ্ছনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এ যেন এই অঞ্চলের লাখো মানুষের প্রতিদিনের নীরব কান্নার প্রতিচ্ছবি।

‎‘তবে অন্ধকারের শেষেই তো আলোর জন্ম। একজন সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের হাত ধরে হাসপাতালটি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ‘রহস্যময় অগ্নিকাণ্ড’ এর মতো কালো ছায়া সেই স্বপ্নকে বারবার পুড়িয়ে ছারখার করতে চাইছে। কেন এই অদৃশ্য বাধা? কার স্বার্থে বারবার বিপন্ন হচ্ছে হাজারো অসহায় রোগীর জীবন?’

‎অধ্যাপক এডওয়ার্ড রিয়াজ মাহমুদের সেই চিরন্তন কথার সূত্র ধরে আজ আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে একটাই চাওয়া- ‘শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা কংক্রিটের দেয়াল নয়, শেবাচিম হাসপাতাল হয়ে উঠুক একটুখানি সহমর্মিতা, ভালোবাসা আর পরম নিরাপত্তার এক টুকরো নীড়।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com