February 26, 2026, 1:45 pm
বিপ্লবী ডেস্ক ॥
বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় চার জেলা সদরে জলবায়ু-সহিষ্ণু হাঁস পালন সম্প্রসারণের নামে প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটিতে ২ টনের দুটি এসি (শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র) কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার ব্যয় এক জায়গায় দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ৫ লাখ টাকা, আরেক জায়গায় ৪ লাখ টাকা মাত্র! আরও অদ্ভূত ব্যাপার হলো, ছোট এ প্রকল্পের কাজ উপকূলীয় এলাকায় হলেও এসি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে ঢাকায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অফিসে ব্যবহারের জন্য। এছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে একের পর এক ত্রুটি, যাতে প্রকল্পটির প্রস্তুতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলা সদরে হাঁস পালনের প্রকল্প নেওয়ার কোনো মানেই হয় না। হাঁস পালন হবে গ্রামে, যেখানে রয়েছে বিস্তৃত জমি, খাল-বিল। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই হাঁস পালন করা হয়। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও দক্ষ করে তুলতে পারলে উৎপাদন বাড়বে। সেটা না করে সদরে করা হয়েছে; যেখানে সচরাচর মানুষ হাঁস পালন করে না বললেই চলে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের প্রধান মো. হেমায়েত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) অফিসের জন্য এসির প্রয়োজন রয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের অফিস বরিশাল অঞ্চলেই হবে। তবে ঢাকায় অধিদপ্তরের অফিসের জন্য কেন এসির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটা বোধগম্য নয়। যদি এমনটি হয় তবে ঢাকা অফিসের এসি কেনার প্রস্তাব বাতিল করা হবে।ব্যয়ের তথ্যে গরমিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি এসির দাম তো আর ১৬ কোটি টাকা হতে পারে না। পিইসি সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একেক জায়গায় একেক ব্যয় দেখানোর সুযোগ নেই। সব জায়গায় একই ব্যয় দেখাতে হবে। এখানে টাইপিং মিসটেক হতে পারে। এগুলো ঠিক করতে বলা হয়েছে। সবকিছু তো আর মন্ত্রণালয় দেখতে পারে না, যারা প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি করে, তাদেরও দায় থাকে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বরিশাল সদর, পটুয়াখালী সদর, ঝালকাঠি সদর ও ভোলা সদরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এর মাধ্যমে জেলার হাঁস খামারের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, হাঁসের বাচ্চার চাহিদা পূরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা উপযোগী প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া হবে। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। তিন কর্মশালায় খরচ ১৮ লাখ : ডিপিপিতে জাতীয় পর্যায়ে তিনটি কর্মশালার জন্য ১৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অথচ প্রকল্প এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে শুধু বরিশাল বিভাগের চার জেলা। কেন এই কর্মশালা জাতীয় পর্যায়ে আয়োজন করা হবে, কোথায় হবে, কী বিষয় নিয়ে হবে, কারা অংশ নেবেন, কারা আলোচক থাকবেনÑ এ বিষয়ে কোনো তথ্যই উল্লেখ নেই। একইভাবে পরিবহন সেবার জন্য একটি ডাবল কেবিন পিকআপ সংগ্রহের কথা বলা হলেও তার ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ সংযুক্ত করা হয়নি। অন্যান্য মনিহারি খাতে ১৬ লাখ টাকা ধরা হলেও সেটিও থোক হিসাব। প্রকল্প অফিস ও বরিশাল বিভাগীয় অফিস রিনোভেশনের জন্য ১৫ লাখ টাকা প্রাক্কলন ধরা হয়েছে, কিন্তু কী ধরনের কাজ হবে, কোথায় হবে, কোন আইটেমে কত ব্যয় হবেÑ তার কোনো বিস্তারিত পরিশিষ্ট নেই। বরিশাল বিভাগীয় অফিস রিনোভেশনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সভায় প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছে পরিকল্পনা কমিশন। ভূমি উন্নয়ন খাতে ধরা হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। কিন্তু কোন যন্ত্রপাতি ব্যবহার হবে, কী স্পেসিফিকেশন, বাজারদর কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছেÑ এসব মৌলিক তথ্য ডিপিপিতে নেই। প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় বিভাজনে অনেক জায়গায় সংখ্যা ও পরিমাণ থোক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সরকারি প্রকল্প প্রস্তুতির মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য নয়। আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে ক্রয় পরিকল্পনা নিয়ে। ডিপিপিতে পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে, অথচ বর্তমানে কার্যকর পিপিআর ২০২৫। পরিকল্পনা কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হালনাগাদ বিধিমালা অনুযায়ী নতুন করে ক্রয় পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে। এসি নিয়ে প্রশ্ন : সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে এয়ার কন্ডিশনার ক্রয় প্রস্তাবে। ডিপিপির পণ্য ক্রয় পরিকল্পনায় দুটি ২ টন ক্ষমতাসম্পন্ন এসির দাম ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। অথচ একই ডিপিপির প্রাক্কলিত ব্যয় বিবরণীতে ওই খাতেই ব্যয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৪ লাখ টাকা। একই আইটেমে দুই জায়গায় এমন অমিল কীভাবে সম্ভব, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। উপরন্তু এই এসিগুলো বরিশাল অঞ্চলের খামারে নয়, বরং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখায় কেনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ের উৎপাদন বাড়ানোর প্রকল্পে এসির সুবিধা পাচ্ছে ঢাকার দপ্তর। এই অসামঞ্জস্য দূর করার পাশাপাশি পরিকল্পনা কমিশন জানতে চেয়েছে হাঁস পালন প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা শাখায় এসি কেনার যৌক্তিকতা কী। বরাদ্দের পাঁচগুণ ব্যয় : মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলমান ৩১টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ প্রয়োজন ৬ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে তাদের বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো অনুযায়ী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী নতুন প্রকল্প অর্থায়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণায়ের ফিসকেল স্পেস-এর ঋণাত্মক স্থিতি বিদ্যমান। এক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থায়ন সুস্পষ্ট করতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
Leave a Reply