March 7, 2026, 10:53 am

ঢাকাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তান

বিবিসি নিউজ বাংলা ॥
১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামে একটি ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল পাকিস্তান বনাম আন্তর্জাতিক একাদশের মধ্যে। তখন পাকিস্তান একাদশের পক্ষে একমাত্র বাঙালি ক্রিকেটার ছিলেন রকিবুল হাসান, যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক হয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, স্টেডিয়ামে তখন ৪০ হাজারের মতো দর্শক ছিল। তাদের অনেকই রেডিও নিয়েছিলেন সাথে। এর একটি বড় কারণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন উত্তাল। রেডিওর খবরের দিকে অনেকের মনোযোগ। খেলার মাঠে বসেই অনেকে শুনতে পান যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন। সাথে সাথে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। “জয় বাংলা শ্লোগানে পুরো স্টেডিয়াম মুখরিত হয়ে ওঠে। খেলা বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ দর্শকরা তখন স্টেডিয়াম ছেড়ে রাস্তায়
নেমে আসে,” বিবিসি বাংলার কাছে সেদিনের পরিস্থিতির বর্ণনা করছিলেন রকিবুল হাসান। ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রেডিওতে ভাষণের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন। সাথে সাথে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অফিস-আদালত, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অনেকে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য রাস্তায় নেমে আসে। রেডিওতে ঘোষণা শোনার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও নানা জায়গা থেকে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসলো। হোটেল পূর্বানীর চারপাশ তখন লোকে-লোকারণ্য। কারণ, অনেকই জানতো শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে বৈঠক করছেন। মার্চ মাসের দুই তারিখে ঢাকায় এবং তিন তারিখে সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়া হলো। এছাড়া মার্চ মাসের চার তারিখ থেকে ছয় তারিখ পর্যন্ত দেশজুড়ে স্বতঃ:স্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। মার্চ মাসের চার তারিখ থেকে ছয় তারিখ পর্যন্ত ঢাকায় প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত হরতাল চলতে থাকে। এমন অবস্থায় দোসরা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্র নেতারা। পরিস্থিতি তখন আর পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই।
ড. ওয়াজেদ মিয়া লিখেছেন, “এক পর্যায়ে খন্দকার মোশতাক কাকাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, ইশতেহারে স্বাধীনতা ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে কিনা।” “তিনি (খন্দকার মোশতাক) বলেন যে, সামরিক শাসনের ক্ষমতাবলে জারীকৃত আইনগত কাঠামো-এর অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঢাকায় বসে পাকিস্তানের অখণ্ডতা লঙ্ঘন সংক্রান্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার ব্যাপারটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং এই ব্যাপারটা এই ইশতেহারে লেখা হয়নি,” লিখেছেন ড. ওয়াজেদ মিয়া। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে নৌকা আকৃতির মতো করে জনসভার মঞ্চ করা হয়েছিল। সকাল থেকেই লাখো মানুষ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের দিকে যেতে থাকে। পুরো রেসকোর্স ময়দান ও তার আশপাশের এলাকা একবারে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিকেল চারটার পর শেখ মুজিবুর রহমান সভাস্থলে আসেন। সে ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান অহিংস এবং অসহযোগ আন্দোলন আরও জোরদার করার আহবান জানান। একই সাথে তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রতি চারটি দাবি তুলে ধরেন। ১. অবিলম্বে মার্শাল ল প্রত্যাহার করতে হবে। ২. জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। ৩. সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। ৪. সেনাবাহিনীর গুলি বর্ষণ ও মানুষ হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে হবে।
তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, সামরিক শাসন তুলে নেয়া এবং সৈন্যদের ব্যারাকে ফেরত নেয়াসহ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি চারটি শর্তের ব্যাপারেই শুধু শেখ মুজিব তাঁর সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনোভাব দেখে বেশ চিন্তায় পড়ে যায় পাকিস্তান সরকার।
রেসকোর্স ময়দানে মানুষের যে জোয়ার এসেছিল সেটি জনসভা শেষে ভাটার মতো মিলিয়ে গেল। মানুষজনকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোন মসজিদ বা চার্চের ধর্মীয় জমায়েত থেকে ফিরছে, যেখানে তারা সন্তুষ্টির বাণী শুনেছে। মার্চে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন। মার্চে সরকারের এক তথ্য বিররণীতে বলা হয়, সপ্তাহ-জুড়ে সহিংসতায় ১৭২ জন নিহত এবং ৩৫৮জন আহত হয়। এদের মধ্যে ৭৮ জন নিহত হয় চট্টগ্রামে বিক্ষোভকারীদের নিজেদের মধ্যে সংঘাতে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © All rights reserved © 2024 DailyBiplobiBangladesh.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com