একুশ শতকের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ববাণিজ্যের আধুনিক সমীকরণ আর কেবল পণ্য উৎপাদনে দক্ষ শ্রম কিংবা সস্তা খরচের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল নয়। বর্তমান বিশ্ববাজারে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি এখন নিরবচ্ছিন্ন, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিরাপত্তার হাতে বন্দী।
আন্তর্জাতিক বাজার যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, কার্বন নিঃসরণ কমানোর ডিকার্বনাইজেশন উদ্যোগ এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে নতুন করে পুনর্গঠিত হচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি এক নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতি এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এখন এক চরম সংকটপূর্ণ ও জটিল সন্ধিক্ষণে নিপতিত। বিগত দুই দশকে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উদীয়মান এক অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের যে রূপকথা বৈশ্বিক মঞ্চে বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তিই ছিল দেশের তৈরি পোশাক খাত এবং সস্তা শ্রমব্যবস্থা। তবে এই অর্জনের আড়ালে আমাদের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই কাঠামোর চরম অভাব এখন দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল মূল্য, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদের ক্রমাগত ঘাটতি বাংলাদেশকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অতি সম্প্রতি ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তা কেবল একটি সাধারণ যান্ত্রিক দুর্ঘটনা ছিল না; বরং তা দেশের ভঙ্গুর জ্বালানি অবকাঠামোর নগ্ন রূপটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
ঘটনার রাতেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ বন্ধ হয়ে যায়, যার ধাক্কায় দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এবং শিল্পাঞ্চলগুলোর উৎপাদন নিমেষেই স্থবির হয়ে পড়ে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান পূর্বশর্ত যেখানে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়া (লিড টাইম) এবং গুণগত মান রক্ষা করা, সেখানে জ্বালানি সংকটের এই দীর্ঘসূত্রিতা বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্যের মূলস্রোত থেকে ছিটকে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে কেবল তৈরি পোশাক খাত থেকেই এসেছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়। সে হিসেবে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশ অবদানই তৈরি পোশাক খাতের। অর্থাৎ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল ভিত্তিই দাঁড়িয়ে আছে এই একক খাতের ওপর। ফলে এই খাতে যেকোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের অর্থ হলো সমগ্র জাতীয় অর্থনীতিকে এক প্রলয়ঙ্কারী বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া।
চলমান গ্যাস সংকটের কারণে অন্যান্য কারখানার মতো দেশের পোশাক খাতেও উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য সাধারণত ৩ থেকে ৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি) চাপের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে বিশেষ করে ডায়িং ও প্রসেসিং ফ্যাক্টরিগুলোতে ৪ পিএসআই-এর নিচে চাপ নামলে উৎপাদন একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পঘন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ শূন্য থেকে ১ পিএসআই-এর মধ্যে নেমে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে উদ্যোক্তারা কারখানা বন্ধ রাখতে এবং ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) উদ্বেগজনক তথ্যানুযায়ী, তীব্র গ্যাস সংকটে নিটওয়্যার শিল্পের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ৩০০ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দেশের প্রায় দেড় থেকে দুই মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া নরসিংদী, গাজীপুর, সাভার ও ময়মনসিংহে শতাধিক টেক্সটাইল ও ওয়াশিং ইউনিট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন উদ্যোক্তারা।
আর যেসব কারখানা কোনোমতে চালু রয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়; অধিকাংশ জায়গায় উৎপাদন সক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশেষ করে বস্ত্র খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সংযোগ শিল্প হিসেবে পরিচিত ডায়িং ও ওয়াশিং ফ্যাক্টরিগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, গ্যাস সংকটের কারণে এই মুহূর্তে টেক্সটাইল খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানাই প্রায় বন্ধের পথে চলে গেছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের জন্য বড় এক ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বৈত আর্থিক সংকট ও আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ হারানোর শঙ্কা।
একদিকে গ্যাসের প্রবাহ না থাকলেও শিল্পমালিকদের প্রতি মাসে বিতরণ সংস্থাগুলোর ফিক্সড মিনিমাম ও ডিমান্ড বিল মেটাতে হচ্ছে, অন্যদিকে চড়া দামে বিকল্প জ্বালানি (যেমন এলপিজি বা ডিজেল) সংগ্রহ করে জেনারেটর বা বয়লার চালিয়ে কারখানা সচল রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে উদ্যোক্তারা চরম হিমশিম খাচ্ছেন।
বিকল্প উৎসের চরম ব্যয়ের কারণে উৎপাদনের ইউনিট কস্ট অনেক বেড়ে যাচ্ছে, অথচ বিশ্ববাজারের মন্দার কারণে বিদেশি ক্রেতারা পণ্যের মূল বাড়িয়ে দিতে নারাজ। এর মাঝেই নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করতে না পারায় অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে তাদের ক্রয়াদেশ কমিয়ে ভারতের ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকেই ঝুঁকবে, যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গাটি দ্রুত হারাতে বসেছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম স্পষ্ট ব্যক্ত করেছেন যে, বাংলাদেশের একাধিক বায়িং অর্ডার অন্য দেশে শিফট হয়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট তথ্য তারা পাচ্ছেন এবং তার নিজের কারখানারও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। কারণ সময়মতো পণ্য সরবরাহ না পেলে আন্তর্জাতিক বায়াররা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
গালপেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক রেজাউল আলম মীরু জানান, উৎপাদনে বিলম্ব ঘটায় গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চমানের বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ও বড় বড় বায়ারদের (যেমন এইচঅ্যান্ডএম) মধ্যে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে তীব্র অস্বস্তি এবং আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। যেসব শিপমেন্ট আগামী দু-এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, গ্যাসের চাপের অভাবে সেগুলোর নির্ধারিত সময়সীমা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
এমনকি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাদের কারখানাগুলোতে ১৫-২০ দিন ধরে গ্যাস না থাকায় বায়াররা শিপমেন্টের বিলম্ব দেখে সুনির্দিষ্ট অর্ডার ক্যানসেল করে বিকল্প দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে সেই কাজ স্থানান্তর করছেন।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানান, একটি তৈরি পোশাকের অর্ডার হঠাৎ অন্য দেশে সরানো জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয় হলেও, দীর্ঘমেয়াদী গ্যাসের সমস্যা ও উৎপাদন বন্ধ থাকা সে পথটিই সুগম করে দিচ্ছে। বর্তমানে কোনো কারখানা আর শতভাগ বা পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না; গড়ে পুরো খাতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে, তা অস্বীকার বা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সমস্যাটির সমাধান যত দ্রুত সম্ভব করা দরকার, কারণ কালক্ষেপণ হলে দেশের প্রধান এই রপ্তানি শিল্পের ওপর এর প্রঘাত আরও ভয়ানক রূপ নেবে। শিল্প উদ্যোক্তাদের মনে ক্ষোভের মূল কারণ কেবল গ্যাস সংকটই নয়, বরং সরকারের দিক থেকে কার্যকর কোনো সমাধানের উদ্যোগ না দেখা যাওয়া।
ব্যবসায়ীদের মতে, সরকার যদি শুরু থেকেই আন্তরিক ও তৎপর হতো, তবে এই সংকটের সমাধান আরও আগেই সম্ভব ছিল। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা একলা চলে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যেখানে এই চরম বিপদের সময়েও শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারীদের জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পর্যন্ত মিলছে না। এর ওপর যোগ হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সহযোগিতার বড় অভাব। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কারখানাগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহ শূন্যের কোঠায় নামলেও ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় আর্থিক নমনীয়তা দেখাচ্ছে না, যা মধ্যম ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দেউলিয়া হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় স্পষ্ট যে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের টেকসই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কেবল সস্তা শ্রমভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর আর নিরাপদ থাকতে পারে না। আধুনিক বিশ্ব বাণিজ্য যখন কার্বন কমানোর চাপ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারে জোর দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এখনও ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ও টেক্সটাইল শিল্পে প্রাথমিক গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করতেই প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। যদি ইউরোপ-আমেরিকার বায়াররা স্থায়ীভাবে ‘নিয়ারশোরিং’ নীতি মেনে মেক্সিকো, তুরস্ক বা ভিয়েতনামের মতো দেশে তাদের নিশ্চিত সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলে, তবে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান হারাবে।
সংকট কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জায়গা নিরাপদ করতে হলে অবিলম্বে সরকারকে একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে অংশীজনদের সাথে উন্মুক্ত সংলাপে বসতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি, সিঙ্গেল-পয়েন্ট টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প এলএনজি অবকাঠামো তৈরি এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাসের উচ্চ চাপ বজায় রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একইসঙ্গে কারখানাগুলোতে সহজ শর্তে সোলার ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে ঋণ সুবিধা দেওয়া এবং ব্যাংকিং সহায়তার হাত বাড়ানো জরুরি। চার দশকে অর্জিত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের এই বৈশ্বিক সুনাম ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে কালক্ষেপণ না করে এখনই টেকসই ও গতিশীল নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।