চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ইউরোপের বাজারে চীনা পণ্যের ক্রমবর্ধমান প্রবেশ ঘিরে সৃষ্ট সংকট ইউরোপকে উদ্বেগে ফেলে দিয়েছে।
এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা আরও বেড়েছে। ফলে এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ইউরোপ। তারা চীনা পণ্যের ঢল ঠেকাতে নেতারা ইইউর হাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে চাচ্ছেন। এই অবস্থায় চীন ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে উঠেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, চীনের সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিষয়টিকে ইউরোপীয় শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছেন ইইউ নেতারা।
সংকট নিরসনে আলোচনার শেষ সুযোগ হিসেবে বেইজিংয়ে যাচ্ছে ইইউর শীর্ষ বাণিজ্য প্রতিনিধিদল। একই সময়ে জার্মানি ও ফ্রান্স চীনা পণ্যের ঢল ঠেকাতে ইউরোপীয় কমিশনের কঠোর সিদ্ধান্ত দাবি করেছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইইউর বাণিজ্য প্রধান মারোস সেফকোভিচ ও চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনটাওয়ের মধ্যে দুই দিনের বৈঠক হতে যাচ্ছে। ব্রাসেলস এই বৈঠককে ‘লাস্ট চান্স স্যালুন’ বা শেষ সুযোগের বৈঠক হিসেবে দেখছে।
গত জুনেও ব্রাসেলসে চীনের সঙ্গে ইউর আলোচনা হয়। এর পরও বাণিজ্য ভারসাম্যের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এবার অন্তত একটি প্রাথমিক সমঝোতার ‘প্রুফ-অফ-কনসেপ্ট’ বা বাস্তব পদক্ষেপ চায় ইউরোপ। বিশেষ করে চীনা পণ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বেইজিংকে চাপ দিচ্ছে তারা।
বাণিজ্য ঘাটতিই বড় উদ্বেগ
ইউরোপ-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার প্রধান কারণ ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি। ২০২৪ সালে চীনের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৩০৬ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ইউরোতে, যা প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি।
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর ঘাটতি ৪০০ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ইউরোপের অভিযোগ- চীনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, সস্তা ঋণ এবং শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর নীতির কারণে দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। ফলে চীনের অতিরিক্ত পণ্য ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজারে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে।
এতে ইউরোপীয় শিল্প চাপের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপের বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি, ব্যাটারি, সৌর প্যানেল, রাসায়নিক পণ্যবাজার হুমকির মুখে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন বলেই ফেলেছেন, পরিস্থিতি এখন ‘টিপিং পয়েন্টে’ পৌঁছেছে। ইউরোপের শিল্পাঞ্চল টিকে থাকার ঝুঁকিতে পড়েছে।
চীনের পালটা যুক্তি
ইউরোপের অভিযোগের বিপরীতে চীন পাল্টা যুক্ত দিয়েছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য, ইউরোপ-চীন বাণিজ্য ঘাটতির দায় শুধু চীনের ওপর চাপালে হবে না। ইউরোপের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও জলবায়ু নীতিই চীনা পণ্যের চাহিদা বাড়িয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইউরোপের সবুজ রূপান্তর, বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ফলে ইলেকট্রিক গাড়ি, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও ব্যাটারি তৈরির রাসায়নিকের চাহিদা বেড়েছে। চীনের দাবি, তারা মূলত সেই চাহিদাই পূরণ করছে।
চীন একই সঙ্গে আমদানি কোটা বা রপ্তানি সীমাবদ্ধতার মতো পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে। ফলে আলোচনায় বেইজিং বড় ছাড় দেবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে ইউরোপের।
শেষ সুযোগ কাজে লাগাতে চায় ইউরোপ
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের ভাষ্য, বেইজিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ইউরোপের প্রধান লক্ষ্য হলো চীনের কাছ থেকে অন্তত এমন একটি পদক্ষেপ আদায় করা, যা ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে।
ব্রাসেলস চায় চীন নিজেই কিছু খাতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করুক। বিশেষ করে চীনা বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির প্রবাহ নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগ বেশি। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, স্বেচ্ছায় রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম লঙ্ঘন না করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।
ইইউর বাণিজ্য প্রধান সেফকোভিচ মনে কৌশলগত খাতে চীনা আমদানি কমানো, চীনে ইউরোপীয় পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, বিশেষ করে বিরল মাটির খনিজ বা রেয়ার আর্থের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
জার্মানি-ফ্রান্সের নতুন ‘অস্ত্র’
চীনা পণ্যের ঢল মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে চায় জার্মানি ও ফ্রান্স। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি নতুন বাণিজ্যিক হাতিয়ার তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এ বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের কাছে যৌথ প্রস্তাব দিয়েছেন।
দ্যা ইকোনোমিস্ট বলছে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো কোনো দেশের বাণিজ্যিক পদক্ষেপ ইউরোপীয় শিল্পের জন্য হুমকি হয়ে উঠলে ইইউ যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।
কয়েক দিনের মধ্যেই পদক্ষেপ চায় ফ্রান্স ও জার্মানি
দেশ দুটির দাবি, প্রয়োজনে ইউরোপীয় বাজারে কোনো দেশের পণ্যের প্রবেশ সীমিত বা বন্ধ করার ক্ষমতা থাকতে হবে ইইউর। রাসায়নিক, প্লাস্টিক, গাড়ি ও অন্যান্য কৌশলগত শিল্পকে এ ধরনের ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা বলেছে প্যারিস ও বার্লিন।
জার্মানি-ফ্রান্সের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেকশন ৩০১’-এর ইউরোপীয় সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন বাণিজ্য আইনের এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের বাণিজ্যিক নীতি বা চর্চাকে অন্যায্য মনে করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিতে পারে।
ইউরোপও এখন এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যার মাধ্যমে চীনের মতো বড় বাণিজ্য অংশীদারের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে দ্রুত পালটা পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
তবে এই উদ্যোগ ইউরোপ-চীন উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। চীন এরই মধ্যে বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সূত্র : দ্য ইকোনোমিস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট