মঠবাড়িয়া উপজেলার টিয়ারখালী ২০ শয্যা হাসপাতালে তিন বছর ধরে মিলছে না চিকিৎসা সেবা। প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কোড না হওয়ায় জোটে না বেতন-ভাতা। ফলে ১৬টি শূন্যপদে যোগদান করছেন না কোনো চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী।
চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা হতদরিদ্র লোকজন হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যমতে, উপকূলের মঠবাড়িয়া, বামনা, পাথরঘাটা উপজেলার জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে টিয়ারখালী ২০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণ করে পিরোজপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তিন একর জমির ওপর তিনটি আবসিক কোয়ার্টারসহ হাসপাতালটি নির্মাণে ব্যয় হয় ১৭ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২১ সালের ৫ অক্টোবর স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত কমিটির কাছে হাসপাতালটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসক, নার্স-কর্মচারী, ওষুধ ও আসবাব নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় বহির্বিভাগ চালু করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও হাসপাতালটির প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কোড চালু করা হয়নি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসক ও নার্স নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালালেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বহির্বিভাগের চিকিৎসা কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের দাবির মুখে প্যারাসিটামল, কৃমিনাশক ট্যাবলেট, খাবার স্যাল্যাইন দিয়ে টিয়ারখালী হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা চালু করে কর্তৃপক্ষ। সেখানে একজন স্বাস্থ্য সহকারী, দুজন সিনিয়র নার্স ও একজন ধাত্রী (মিডওয়াইফ) নিযুক্ত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার কথা, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।
রানু বেগম নামে এক বৃদ্ধা জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁর মতো শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক থাকেন না, ওষুধও পাওয়া যায় না। চিকিৎসা না পেয়েই ফিরে যেতে হয় তাদের।
রাণী বেগম নামে একজন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার যাওনের পর হাসপাতালের চিকিৎসাও বন্ধ হইয়া গেছে। মোরা গরিব মানুষ, ১৫০-২০০ টাহা খরচ কইরা যে মঠবাড়িয়া যাইয়া ডাক্তার দেহামু হেই টাহা পামু কই।’
হামিদা বেগম জানান, প্রত্যন্ত এলাকার অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী মঠবাড়িয়া হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রওনা হলে পথেই প্রসব হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন বলেন, এত সুন্দর ভবন বানানো হলো, কিন্তু এটি এখন কিশোর গ্যাং ও মাদকসেবীদের আড্ডা ও গরু-ছাগলের ঘরে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ এভাবে নষ্ট হতে দেখে হতাশ এলাকাবাসী।
মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে হলতা গুলিশাখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে টিয়ারখালী ২০ শয্যা হাসপাতাল। গত শনিবার দেখা যায়, কাশবন ঘেরা জমিতে হাসপাতাল ভবন। চিকিৎসক-কর্মচারীদের
থাকার জন্য রয়েছে তিনটি কোয়ার্টার।
বাইরে ২০ শয্যা লেখা থাকলেও আদতে একটি শয্যাও চোখে পড়েনি।
বেলা ১১টার দিকে বহির্বিভাগে দেখা গেল ধাত্রী হাসি আক্তার কয়েকজন নারী রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। আলাপকালে হাসি আক্তার জানান, একজন স্বাস্থ্য সহকারী, তিনিসহ তিনজন নার্স দায়িত্ব পালন করছেন। তারা কোথায় জানতে চাইলে বলেন, তারা পথে আছেন। আপনি কীভাবে রোগী দেখেন– এমন প্রশ্নের জবাবে হাসি বলেন, রোগীর রোগের কথা শুনে প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ দেওয়া হয়।
এদিকে সংবাদকর্মীদের হাসপাতালে আসার খবর পেয়ে ছুটে আসেন স্বাস্থ্য সহকারী ডা. সৌরভ হালদার, সিনিয়র নার্স রণজীতা সিংহ ও শিমুল খানম। বিলম্বে আসার কারণ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সহকারী সৌরভ হালদার বলেন, অফিসে টেবিল-চেয়ার না থাকায় স্থানীয় টিয়ারখালী বাজারে বসেছিলেন। চিকিৎসা না নিয়ে রোগীরা ফেরত যাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমি সপ্তাহে তিন দিন আসি, অন্য তিন দিন নার্সরা ওষুধপত্র দেন।’ সিনিয়র নার্স রণজীতা সিংহ জানান, তারা দুজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধ আনতে গিয়েছিলেন, যে কারণে আসতে বিলম্ব হয়েছে।
হাসপাতালের কোয়ার্টারের একমাত্র বাসিন্দা ধাত্রী হাসি আক্তার। তাঁর ভাষ্য, প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই হাসপাতালের ফটকের তালা ভেঙে উঠতি বয়সী ছেলেরা ভেতরে ঢুকে আড্ডা দেয়। নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় পরিবারের ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে আতঙ্কে রাত কাটাতে হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সৌমিত্র সিনহা রায় জানান, টিয়ারখালী হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট একজন, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা কাম সুপারিনডেন্ট (আরএমও) একজন, অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন একজন, সিনিয়র স্টাফ নার্স ছয়জন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ল্যাব একজন, ফার্মাসিস্ট একজন, অফিস সহকারী একজন, অফিস সহায়ক একজনসহ মোট ১৬টি পদই শূন্য। তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো চিকিৎসক-কর্মচারী যোগদান করলে কেউ বেতন তুলতে পারবেন না। যে কারণে কয়েক বছর ধরে সব পদই শূন্য রয়েছে।’ তিনি স্বীকার করেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় হাসপাতালের ভেতরে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ রয়েছে। এ ছাড়া উঠতি বয়সী ছেলেদের আড্ডাসহ গবাদি পশুর অবাধ বিচরণ রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাকিল সরোয়ার বলেন, টিয়ারখালী হাসপাতালটি পাঁচ বছর আগে চালু হলেও প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কোড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই কোড চালু করতে তিনি নিজেও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তদবির করেছেন। মূলত এটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরপরই চিকিৎসক ও কর্মচারীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে গেছেন। তিনি জানান, এখানকার মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্যারাসিটামল, কৃমিনাশক, খাবার স্যালাইনের মতো মৌলিক কিছু ওষুধ দিয়ে বহির্বিভাগ চালু রাখা হয়েছে। তবে দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মতিউর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কোড ছাড় করে দ্রুত হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করার জন্য তাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।