রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ০২:১৪ অপরাহ্ন
Logo
সর্বশেষ:
নতুন রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে উঠেছেন, জেনে নিন শতাব্দীপ্রাচীন ভবনটির ইতিহাস বাংলাদেশিসহ ২৪ ক্রু নিয়ে ওডিশা উপকূলের কাছে জাহাজডুবি, দুজন উদ্ধার মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, আরও পরিবর্তনের সম্ভাবনা মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের সামনেও নতুন যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে অংশুর সিনেমায় ‘লাপাতা লেডিস’-এর গল্পকার শরীফুল-আগুনে পুড়ল অস্ট্রেলিয়া, ম্যাকাইয়ে ঘুরে দাঁড়াল বাংলাদেশ মূল ভূখণ্ডে যুক্ত হচ্ছে ভোলা বাউফলে ৮০০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার সংবাদমাধ্যমে পরিবর্তন আসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় পলিটিক্যাল সিস্টেম বরিশাল জেলা ডিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের হয়রানির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন

মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের সামনেও নতুন যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে

প্রতিবেদকের নাম / ০ সময় দৃশ্য
আপডেট: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

মুসলমানদের কাছে মক্কা যেকোনো শহরের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শাসকেরা যে এ শহরকে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এমনকি চুক্তিবদ্ধ হওয়ার জন্য শুক্রবারকে বেছে নেওয়াও একই বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

ত্রিদেশীয় এই জোট একটা ধর্মীয় প্রচ্ছদ পাক, সেটাই হয়তো চেয়ে থাকবেন মোহাম্মদ বিন সালমান, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও শাহবাজ শরিফ। নিজ নিজ দেশে ভোটের মেরুকরণে এ ধরনের ধর্মীয় প্রচ্ছদ তাঁদের সাহায্য করবে। যদিও গাজায় আগ্রাসনকারীদের রুখতে এসব শাসকেরা উল্লেখযোগ্য কিছু করেননি।

শুক্রবার মক্কায় যেকোনো চুক্তি স্বাক্ষরকারীদের অঙ্গীকারের দৃঢ়তাও প্রকাশ করে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিরক্ষাচুক্তির মাধ্যমে ঠিক কী রক্ষা করতে চাইছে এসব দেশ? তিন মাঝারি সমরশক্তির এই কাছাকাছি আসা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বাড়তি কোনো তাৎপর্য বহন করে কি না?

কৌশলগত বহুমুখিতা শুরু চারদিকে

ত্রিদেশীয় এই চুক্তিভুক্তরা সীমান্তসংলগ্ন নয়। ফলে একে আঞ্চলিক জোট বলা যায় না। সৌদি আরবের বাড়তি আগ্রহই যে শাহবাজ শরিফ ও এরদোয়ানকে মক্কায় টেনে এনেছে, সেটা অনুমান করা যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করে যেসব শাসক এত দিন মসনদ রক্ষা করেছে, তাদের সেই পুরোনো সুবিধার অবসান ঘটতে চলেছে ক্রমে। এ অঞ্চলের রাজপরিবারগুলো বহুকাল এ রকম সুরক্ষাব্যবস্থায় নিরাপদে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষশক্তির মোকাবিলায় নেমে ইরান ওয়াশিংটনের আরব মিত্রদের পুরোনো সেই সুরক্ষার ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

এ দৃশ্য থেকে বিশ্বের অনেক দেশ তাৎক্ষণিক কিছু শিক্ষা নিয়েছে। সবাই নিজ নিজ প্রতিরক্ষা নীতি-কৌশল পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাস করছে। কৌশলগত বহুমুখিতা শুরু হয়েছে চারদিকে। মক্কা চুক্তি তার প্রথম বড় প্রকাশ। রূঢ় এক বাস্তবতার চাপই দূরে দূরে থাকা তিন শক্তিকে কাছাকাছি এনেছে। তবে চুক্তিবদ্ধ সবাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা না ছেড়েও নিজ নিজ আন্তর্জাতিক ইমেজে বাড়তি ভার যোগ করতে পারল। চুক্তির পরও রিয়াদ-ওয়াশিংটন, ইসলামাবাদ-বেইজিং সখ্য থাকছে। তুরস্ককেও ন্যাটো ছাড়তে হচ্ছে না।

এ চুক্তি অর্থনৈতিক পটভূমিও বিবেচনায় রাখার মতো। উপসাগরীয় দেশগুলো বৈশ্বিক পুঁজিতন্ত্রের বড় এক ভরকেন্দ্র। আগ্রাসনের মুখে ইরানের পাল্টা আঘাত সেখানকার সম্পদ ও বিনিয়োগে ঝাঁকুনি দিয়েছে। পুঁজিতান্ত্রিক এই ভরকেন্দ্রগুলো সুরক্ষার ব্যাপারও অনেকের কাছে দরকারি ছিল। ফলে মক্কা চুক্তিতে কেবল তিন দেশের স্বার্থ জড়িত, এমন নয়; এর একটা বড় পলিটিক্যাল ইকোনমিও আছে। তবে চুক্তির মুহূর্তটার চেয়েও সবাই দেখতে আগ্রহী, কতটা গুরুত্ব দিয়ে তিন দেশ সেটাকে কাজে লাগাচ্ছে। ন্যাটোর মতো এর কোনো একক কমান্ড স্ট্রাকচার থাকবে কি না, সে–ও স্পষ্ট নয় এখনো।

এ রকম পাল্টাপাল্টি চুক্তি ও জোটের একটা ছাপ ও চাপ পড়বে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কায়ও। এসব দেশের পক্ষে বড়দের সামরিকায়নে পাল্লা দেওয়া দুরূহ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এসব দেশ গত কয়েক মাস হাবুডুবু খাচ্ছে। এখন সামনে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এক সামরিক জটিল অধ্যায়ও অপেক্ষা করছে। মক্কা চুক্তি যেমন দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও সৌদি আরবকে সরাসরি যুক্ত করছে, তেমনি একই উপলক্ষ ইসরায়েলের অধিকতর সক্রিয়তারও কারণ ঘটিয়েছে।

মক্কা চুক্তি ভারত-ইসরায়েলকে আরও কাছে আনছে

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ও এর ফলাফল যে এ চুক্তির পটভূমি তৈরি করেছে, সেটা না মেনে উপায় নেই। চুক্তি স্বাক্ষরকারী তিন শাসকই যুক্তরাষ্ট্রের কমবেশি ঘনিষ্ঠ। এসব কারণেই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, চুক্তির প্রতিপক্ষ ইরান কি না? ইসরায়েলের কথাও কেউ কেউ ভেবে থাকবেন।

চুক্তি স্বাক্ষরের আগমুহূর্তে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, তাঁদের জন্য এ চুক্তি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ? বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বৈরী সম্পর্কের পটভূমিতে ত্রিদেশীয় এই সামরিক জোট নয়াদিল্লির জন্য অধিক চাপ তৈরি করল কি না? তারাও কি তবে ‘প্রতিরক্ষা’ সক্ষমতা বাড়াতে অন্য কারও সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে চাইবে?

চুক্তিতে রয়েছে, আলোচ্য তিন শরিকের কেউ আক্রান্ত হলে সেটা তিন দেশের আক্রান্ত হওয়া হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। এই অনুচ্ছেদ ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো। যার ব্যাখ্যা এ–ও দাঁড়ায়, ভারত-পাকিস্তান যেকোনো ভবিষ্যৎ যুদ্ধে তুরস্ক ও সৌদি আরবও ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়াবে। কিংবা ইরান-সৌদি যেকোনো সামরিক সংঘাতে পাকিস্তান ও তুরস্ক তেহরানের বিরুদ্ধে লড়বে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে সৌদি আরবে কিছু পরিমাণে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং জওয়ান মোতায়েন করেছে। ত্রিদেশীয় এ চুক্তির আগে গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের পৃথক আরেকটি সামরিক চুক্তি হয়েছিল। পরের চুক্তি নিঃসন্দেহে আগের চুক্তির চেয়ে বড় আকারের অগ্রগতি।

মক্কা চুক্তির স্বাক্ষরকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু যে নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করলেন, সেটা অবশ্যই ইঙ্গিতপূর্ণ।

এসব স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, এশিয়ায় সামরিক চিন্তা ও কাঠামোতে ভাঙাগড়া আসন্ন। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন, ‘এ চুক্তি অন্য দেশের জন্যও উন্মুক্ত।’ তাঁর এ বক্তব্যের পর কৌতূহল তৈরি হয়েছে, সম্ভাব্য অন্য দেশগুলো কারা হতে পারে?

মক্কা চুক্তির স্বাক্ষরকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু যে নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করলেন, সেটা অবশ্যই ইঙ্গিতপূর্ণ। সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের দিক থেকে তারা এ মুহূর্তে নতুন কোনো বৈরিতার মুখে নেই। কিন্তু মুসলমানপ্রধান তিন দেশের সামরিক জোটের খবরকে তারা দূরবর্তী হুঁশিয়ারসংকেত হিসেবে নিয়েছে। যেমনটা ইরানের বেলায়ও সত্য।

সিরিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় তুরস্কের সঙ্গে তেল আবিবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। ইরানের পাশাপাশি তুরস্ককেও ইসরায়েলের অনেক রাজনীতিবিদ ‘হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করছেন ইদানীং। যদিও তুরস্ক মুসলমান বিশ্বে তাদের সবচেয়ে পুরোনো কূটনৈতিক বন্ধু। মুসলমানপ্রধান পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকেও তারা ‘বিপজ্জনক’ মনে করে। এসব কারণে ত্রিদেশীয় এ চুক্তিকে তেল আবিবের সুনজরে দেখার কারণ নেই। জেরুজালেম পোস্ট ৯ আগস্ট লিখেছে, ‘মক্কা চুক্তি ইসরায়েল-ভারত সম্পর্ককে আরও বিকশিত করবে।’ উভয় দেশ একই লক্ষ্যে আরব আমিরাতকেও কাছে টানতে চাইছে।

বাড়তি সামরিকায়নের চাপে দক্ষিণ এশিয়া

মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের সামনেও কিছু নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের কি এ রকম জোটে যুক্ত হওয়া উচিত? কিংবা এ চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল-ভারত সামরিক ঘনিষ্ঠতা বাড়ার মুখে বাংলাদেশের করণীয় কী হবে? নিশ্চয়ই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা এসব নিয়ে ভাবতে বসেছেন ইতিমধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সংঘাত যেভাবে শেষ হচ্ছে, তাতে মুসলমান বিশ্বে তেহরানের একটা শক্তিশালী-সাহসী ইমেজ দাঁড়িয়ে গেছে। এতে মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখতে সৌদি আরব ও তুরস্ক প্রতিযোগিতায় পড়েছে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামলে নিতে তারা বাংলাদেশকে ক্রমাগত পাশে চাইবে। তুরস্কের দিক থেকে দু-তিন বছর ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ স্পষ্ট।

একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তানের সমর প্রতিযোগিতাও তীব্র গতিতে এগোচ্ছে। ত্রিদেশীয় চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা বাড়ালে দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিশ্চিতভাবে বাড়বে। পার্শ্বফল হিসেবে আঞ্চলিক অনেক প্রক্সি যুদ্ধও দেখতে পারি আমরা।

পাকিস্তানের অর্থনীতি তার বিশাল বিস্তৃত সামরিক কাঠামো ও জনবলের ভার বইতে পারছিল না। কিন্তু তার সামরিক জনবল অনেকগুলো যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। সৌদি অর্থ এবং তুরস্কের সমরশিল্প তাতে নবযৌবন দিতে পারে। তিন দেশই উপকৃত হবে এ প্রক্রিয়ায়। এর পাল্টা হিসেবে ভারতীয় সামরিক কাঠামোতে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বাড়তি আগমন শুরু হলে নয়াদিল্লির সামরিক সক্ষমতাও নতুন উচ্চতায় যাবে। মক্কা চুক্তির পর ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পাল্টা সামরিক ব্লক তৈরির প্রণোদনা বাড়ছে। ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষাচুক্তি নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা হচ্ছে সেখানে।

এ রকম পাল্টাপাল্টি চুক্তি ও জোটের একটা ছাপ ও চাপ পড়বে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কায়ও। এসব দেশের পক্ষে বড়দের সামরিকায়নে পাল্লা দেওয়া দুরূহ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এসব দেশ গত কয়েক মাস হাবুডুবু খাচ্ছে। এখন সামনে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এক সামরিক জটিল অধ্যায়ও অপেক্ষা করছে। মক্কা চুক্তি যেমন দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতিতে তুরস্ক ও সৌদি আরবকে সরাসরি যুক্ত করছে, তেমনি একই উপলক্ষ ইসরায়েলের অধিকতর সক্রিয়তারও কারণ ঘটিয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com