মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৬ অপরাহ্ন
Logo

ঘুস ছাড়া কিছুই হয় না ভূমি দপ্তরে

প্রতিবেদকের নাম / ০ সময় দৃশ্য
আপডেট: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঘুস ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না বরিশাল সদর ভূমি অফিসে। এ ঘুস বাণিজ্যে পিছিয়ে নেই সদর উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোও। সরকারি নিয়মের বাইরে টাকা দিলেই মেলে সেবা, অন্যথায় ঘুরতে হয় মাসের পর মাস। ভূমি দপ্তরে ঘুস সিন্ডিকেটের কারণে সেবাবঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর পোর্ট রোড এলাকার সদর ভূমি অফিসের অফিস দপ্তরের প্রধান সহকারী দেলোয়ার হোসেন ঘুস বাণিজ্যের মূলহোতা। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন ঘুসের রাজত্ব। এ সিন্ডিকেটে রয়েছে একই দপ্তরের অফিস সহকারী আতিকুর রহমান খান, কম্পিউটার অপারেটর কুতুব উদ্দিন, সার্ভেয়ার জালাল উদ্দিন, সার্ভেয়ার রিয়াজসহ কয়েকজন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জমির মিউটেশন করতে ১১৭৫ টাকা ও অনলাইন চার্জ ৪শ টাকা লাগার কথা থাকলেও প্রতিটি মিউটেশন বাবদ আট থেকে ২০ হাজার টাকা করে গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের। এছাড়া ১৪৩ ও ১৫০ ধারার কেসগুলো কন্ট্রাক চুক্তিতে নেয় দপ্তরের প্রধান সহকারী দেলোয়ার হোসেন।

বরিশাল সদরের চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের মজিবর হাওলাদার বলেন, একটি ১৫০ ধারার কেস সমাপ্তির জন্য বহুদিন ঘুরলেও কোনো কাজ হয়নি। এরপর ওই অফিসের এক দালালের মাধ্যমে প্রধান সহকারী দেলোয়ারের সঙ্গে ৭০ হাজার টাকার চুক্তি করলে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমার কাজ তারা করে দেয়। তবে ঘুসের অভিযোগ অস্বীকার করে দেলোয়ার বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। শুধু মজিবর হাওলাদার নয়, বুধবার ও বৃহস্পতিবার ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা একাধিক ব্যক্তি জানান, নিয়ম মাফিক কোনো কাজ নয়, বরং তাদের নিয়ম অনুসারে ঘুস দিলেই মেলে সেবা। এমনকি ১৫০ ধারার ক্ষেত্রে সরেজমিন সার্ভেয়ার যাওয়ার কথা থাকলেও টাকার বিনিময়ে অফিসে বসেই এ সিন্ডিকেটের সদস্যরা কার্য সম্পাদন করে।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সহকারী ভূমি কমিশনারের আস্থাভাজন হলেন দেলোয়ার। যে কারণে ওই দপ্তরের সব অবৈধ লেনদেনের নিয়ন্ত্রক তিনি। শুধু সদর ভূমি অফিস নয়, বরিশাল সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসেরও একই অবস্থা। টাকা ছাড়া এসব অফিসে কথাও বলতে চায় না কর্মকর্তারা।

কাশিপুর ইউনিয়নের মান্নান খলিফা বলেন, দুটি জমির নামজারি করতে গেলে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন আমার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। এরপর অনেক অনুরোধ করলে ২২ হাজার টাকায় তিনি রাজি হন। যেখানে সরকারিভাবে দুটি জমির নামজারি করতে ২ হাজার ৮শ টাকা লাগার কথা, সেখানে বাড়তি ১৯ হাজার টাকা দিয়ে নামজারি করতে হয়েছে। চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামের মোক্তার হোসেন বলেন, একটি জমির পরচা আনতেও ২ হাজার টাকা দিতে হয় সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে। এছাড়া নামজারির বিষয়ে তো বাড়তি টাকা ছাড়া সম্ভবই নয়। তবে ঘুসের অভিযোগ অস্বীকার করে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, এখানে নিয়ম মাফিক কাজ হয়। ঘুসের বিষয়টি সঠিক নয়। এদিকে চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, সেখানের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় জেলহাজতে গেলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তবে সেই বরখাস্ত আদেশ উপেক্ষা করে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন ঘুস বাণিজ্য। ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হলেন আমানতগঞ্জ ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা হা. ম আব্দুর রহমান। তিনি শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নে থাকাকালীন ঘুস বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা। এরপর তাকে বদলি করে আমানতগঞ্জ ভূমি অফিসে আনা হলে সেখানেও তিনি একই কর্ম শুরু করেন। এসব বিষয়ে বরিশাল সদর ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার আজাহারুল ইসলাম বলেন, পুরোপুরি স্বচ্ছতা আছে, সেটা বলব না। তবে আগে যে পরিমাণ দালাল ছিল সেটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। তবে শতভাগ দালাল মুক্ত হয়নি। তিনি আরও বলেন, যদি কারও বিরুদ্ধে ঘুসের লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com