March 10, 2026, 1:08 pm

রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেতে চান ভোলা উপকূলের নারী জেলেরা

রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেতে চান ভোলা উপকূলের নারী জেলেরা

রাসেল তালুকদার, ভোলা ॥
জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে সাগর-নদীতে মাছ স্বীকার করলেও রাষ্ট্রীয় তালিকায় জেলের স্বীকৃতি না থাকায় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভোলা উপকূলের হাজারো শ্রমজীবী নারী জেলেরা।উপকূলীয় নারী জেলেদের অভিযোগ, পুরুষতান্ত্রিক প্রথা ও তালিকার অসংগতির কারণে বছরের পর বছর অবহেলিতই থেকে যাচ্ছেন তারা। তাই পুরুষের পাশাপাশি নারী জেলেদেরও জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জেলে কার্ড দেয়ার দাবি এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। এদিকে ভোলার উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত নারী জেলেদের জেলে হিসেবে স্বীকৃতি
দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে। মেঘনা, তেতুলিয়া, কালাবাদর, ইলিশা, বেতুয়া আর বুড়াগৌড়ঙ্গ’র মতো অসংখ্য নদী-সাগর বেষ্টিত দ্বীপাঞ্চলের জনপদ জেলা ভোলা। এ জেলার একটি বড় অংশই পেশায় জেলে। জেলেদের মধ্যে নারী জেলে যারা, তারা উপকূল অঞ্চলের নারী মৎস্যজীবী হিসেবেই পরিচিত। তাদের শ্রম আছে, ঘাম আছে, জীবন ঝুঁকি রয়েছে, তবুও তাদের নেই কোনো সরকারি পরিচয়, নেই কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এখানকার হাজারো নারী জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরছেন।তবে সরকারি তালিকায় জেলে হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। নারী হওয়ায় নাম লেখাতে পারছেননা জেলে তালিকায়। তাই পুরুষ জেলেদের মতো নারী জেলেদেরও সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে জেলে কার্ড দেয়ার দাবি উঠেছে। ভোলা সদরের তুলাতুলি মৎস্যঘাটের নদীতে নৌকায় বসবাসরত ষাটোর্ধ্ব নারী জেলে কুলসুম বেগম। জীবিকার তাগিদে স্বামীকে নিয়ে নদীতে থাকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন কয়েক যুগ ধরে। কিন্তু এতো বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারি সহায়তার খাতায় তার নাম নেই। তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি অনেকটা কষ্ট নিয়ে বলেন, আর কত বয়স হলে জেলে কার্ড পামু, সরকারি সহযোগিতা পামু। এই বয়সে নদীতে না গিয়ে ইকটু ঘর করে উপরে থাকতে চাই। রোদে পুরি বৃষ্টিতে ভেজি। এখন সরকার যদি আমাদের ইকটু খোঁজ খবর নিতো তাহলে ভালো হতো।ভোলা সদর রাজাপুর জোরাখাল এলাকার নৌকায় থেকে মাছ ধরেন রাশিদা বেগম (৫৫)। তিনি জানান, আমাগো জন্ম হইছে নৌকার মধ্যে। ছোট বেলা থেইকা নৌকায় থাহি, মাছ ধইরা সংসার চালাই। অথচ সরকারের বড় বাবুগো খাতায় আমাগো কোন নাম নাই। সরকার আমাগোরে কোন জেলে কার্ড দেয়না। সরকার বাড়ি দেয়, ঘর দেয়, কলোনি দেয়। অথচ আমরা কিছুই পাইনা। আমরা নদীতে নদীতে পোলাইন-ছালাইন (সন্তান) লয়া বাস করি। এই বাস করতে করতে বুড়ার বাগী হইছি (বুড়ি হয়েছি) সরকার এ্যাহন পর্যন্ত কিছুই দেয় নায়। নতুন সরকারকে আমরা আশা কইরা ভোট দিছি। আশা করছি তারেক জিয়া যদি সরকার হয় আমাগো দিক চাইবো।এ্যাহন তারেক জিয়া যদি আমাগো দিক চায়, যদি বাড়ি, ঘর কোন হানে লাইন করে দেয়, তাইলে আমরা জেলে কার্ড পামু, ঘর পামু।একই এলাকার ভাসমান নৌকায় আশ্রিত পঞ্চাশোর্ধ্ব জেলে নারী রোজিনা বেগম বলেন, আমরা নদীর মধ্যে থাকি পোলান ছায়ান (ছেলে-সন্তান) নিয়ে অনেক কষ্ট করি। এমনকি পুরুষের থেকে আমরা নারীরা অনেক কষ্ট করি। মাথার ঘাম পায় পড়ে। নদীতে মাছ ধরে দুই হাজার টাকার মাছ বেঁচলে তিন হাজার টাকা বাকি থাকে। ঠিক মতো চাইল, তেল কিনলে বাকি সদায়-পাতি করতে পারিনা। এখন আমাগো জেলে কার্ড কিম্বা ফ্যামিলি কার্ড দিবো সরকার কইছে। সেটা দিলে ভালো হইতো।সংগ্রামী এসব নারীদের জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন এখানকার মৎস্যজীবী নেতারাও। ভোলা জেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ জানান, ভোলাতে পুরুষের পাশাপাশি থেকে প্রায় তিন হাজার নারী রয়েছেন, যারা মৎস্যজীবী পেশার সাথে জড়িত। তিনি বলেন, এসব শ্রমজীবী নারীদের সরকারি জেলে নিবন্ধনের আওতায় এখনও আনা হয়নি। নিবন্ধন না থাকায় এরা সরকারের সব রকম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই পুরুষ জেলেদের পাশাপাশি মহিলা জেলেদেরও যেন নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়। তারা পুরুষের পাশাপাশি অনেক কষ্ট করে মাছ ধরে। তাদের নিবন্ধনের বাহিরে রাখলে দেশ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।এদিকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত নারী জেলেদের জেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা।ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা আগামীতে যখন জেলে নিবন্ধন করবো, তখন নারী জেলেদেরও অগ্রাধিকার দিবো। তবে তাদের স্ব,স্ব উপজেলা ও জেলার নাগরিক হতে হবে। তাদের সুর্নিদিষ্ট স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি। এছাড়াও এবছর জেলেদের বিশেষ খাদ্য বরাদ্দের মধ্যে ৪শত পরিবারকে আমরা সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।ভোলার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দূর্বার নারী আন্দোলনের সমন্বয়ক বিলকিস জাহান মুনমুন বলেন, ভোলার নিন্মাঞ্চল এলাকার নদ-নদীতে খেটে খাওয়া মৎস্যজীবী নারীরা বরাবরই সরকারের দেয়া সুযোগ সুবিধা ও প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত। এসব নারীদের সরকারি সুযোগের তালিকাভূক্ত করা এখন সময়ের দাবি বলেও মনে করেন তিনি।ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.আরিফুজ্জামান বাসসকে জানান, সরকার যখন নতুন করে তালিকা করবে তখন ভোলার মানতা সম্প্রদায়ের নারী ও অন্যান্য নারী জেলেদের নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসবো। পাশাপাশি সরকারের সকল ধরনের সহযোগিতা আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের কাছে পৌঁছে দেবো।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © All rights reserved © 2024 DailyBiplobiBangladesh.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com