সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন
Logo
সর্বশেষ:
প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকিং কতটা শরিয়া অনুসরণ করছে মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলাম যেমন চাই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলতে কী করতে হবে বাংলাদেশকে, অন্য কোন দলের কী সমীকরণ নিজেই অসুস্থ ১১৪ বছরের বরিশাল সদর হাসপাতাল প্রাথমিক শিক্ষার নতুন নীতিমালা: বরিশালে ববি হাজ্জাজ নতুন রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে উঠেছেন, জেনে নিন শতাব্দীপ্রাচীন ভবনটির ইতিহাস বাংলাদেশিসহ ২৪ ক্রু নিয়ে ওডিশা উপকূলের কাছে জাহাজডুবি, দুজন উদ্ধার মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, আরও পরিবর্তনের সম্ভাবনা মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের সামনেও নতুন যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে অংশুর সিনেমায় ‘লাপাতা লেডিস’-এর গল্পকার

প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকিং কতটা শরিয়া অনুসরণ করছে

প্রতিবেদকের নাম / ০ সময় দৃশ্য
আপডেট: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

ইসলামি ব্যাংকিং কি কেবলই একটি সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা, নাকি এটি ন্যায় ও ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক দর্শন? প্রশ্নটি শুধু সাধারণ আমানতকারীদের নয়; বরং বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামিক অর্থনীতিবিদ, ফকিহ এবং আর্থিক নীতি-নির্ধারকদেরও।

বিগত পাঁচ দশকে ইসলামি ব্যাংকিং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় এক বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যেও এর উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। বিশ্বজুড়ে ইসলামি অর্থায়ন আজ ট্রিলিয়ন ডলারের এক সুবিশাল শিল্পে রূপ নিয়েছে।

কিন্তু এই অভাবনীয় সম্প্রসারণের বিপরীতে একটি কাঠামোগত প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—ইসলামি ব্যাংকিং কি তার মূল দার্শনিক চেতনা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, নাকি ক্ষেত্রবিশেষে এটি প্রচলিত ব্যাংকিংয়েরই একটি ‘শরিয়া সংস্করণ’ হয়ে উঠেছে?

শুধু ‘রিবা’ বর্জন নয়

অনেকেই ইসলামি ব্যাংকিংকে কেবল ‘সুদ এড়ানো’র বিকল্প মনে করেন। অথচ কোরআনের দৃষ্টিতে এটি একটি আংশিক ধারণা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)

এই ঘোষণার তাৎপর্য হলো ইসলামি অর্থনীতি শুধু ঋণচুক্তিতে সুদ বর্জন নয়; বরং প্রকৃত বাণিজ্য, বাস্তব সম্পদের মালিকানা, ঝুঁকি গ্রহণ, ন্যায্য মুনাফা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা।

একইভাবে সুরা মায়েদার ১ নম্বর আয়াতে সব চুক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো আর্থিক চুক্তির শুধু বাহ্যিক আইনি রূপ নয়, তার প্রায়োগিক উদ্দেশ্য ও প্রভাবও শরিয়াসম্মত হওয়া আবশ্যক।

ইসলামি চিন্তাবিদ মুহাম্মদ হাশিম কামালি যেমনটি উল্লেখ করেছেন, ইসলামি অর্থায়নের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘মাকাসিদে শরিয়া’—অর্থাৎ মানবকল্যাণ, সম্পদ সংরক্ষণ, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা। আর্থিক কাঠামো যদি দৃশ্যত শরিয়াসম্মত হয়েও এই সামগ্রিক উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে তা ইসলামি অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রতিফলিত করে না। (মুহাম্মদ হাশিম কামালি, মাকাসিদ আশ-শরিয়াহ: ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড গুড গভর্ন্যান্স, লন্ডন: দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট, ২০১১, পৃষ্ঠা: ২১-৩৫)

প্রবৃদ্ধি নাকি গুণগত শরিয়া পরিপালন

বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ইসলামি ব্যাংক, তাকাফুল ও সুকুক বাজার সক্রিয়। ‘অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস’ (এএওআইএফআই) এবং ‘ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বোর্ড’(আইএফএসবি)-এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রণয়নকারী সংস্থাগুলো শরিয়া গভর্ন্যান্সের বিশ্বমান তৈরি করেছে।

তবে বৈশ্বিক সম্পদের পরিমাণ বাড়লেও গুণগত পরিপালন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মসমালোচনামূলক গবেষণা চলছে।

ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. মাহমুদ এল-গামাল তাঁর দেখিয়েছেন, ইসলামিক অর্থায়নে অনেক সময় এমন প্রবণতা দেখা যায় যেখানে প্রচলিত আর্থিক কাঠামোর ফলাফল অপরিবর্তিত রেখে কেবল আইনি চুক্তির সুরত বদলে তাকে শরিয়াহসম্মত করার চেষ্টা চলে; যাকে তিনি ‘শরিয়া আরবিট্রেজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। (মাহমুদ এ. এল-গামাল, ইসলামিক ফাইন্যান্স: ল, ইকোনমিকস অ্যান্ড প্র্যাকটিস, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৬, পৃষ্ঠা: ১-১৬)

একই বিষয়ে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি তাঁর বিভিন্ন ফিকহি সংকলন ও বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বহুবার সতর্ক করেছেন, বিনিয়োগে প্রকৃত ঝুঁকি গ্রহণ, পণ্যের বাস্তব মালিকানা ও হস্তান্তরের মতো মৌলিক শর্তগুলো যদি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়, তবে ইসলামি ব্যাংকিং আর প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের মধ্যে শুধু নামগত পার্থক্য অবশিষ্ট থাকবে এবং এর আত্মিক চেতনা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। (মুহাম্মদ তাকি উসমানি, অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ইসলামিক ফাইন্যান্স, করাচি: মাকতাবা মাআরিফুল কোরআন, ১৯৯৮; বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুআসিরাহ, ১/১১-৩২)

সমকালীন শরিয়া–সংকট

সমকালীন ইসলামি অর্থায়নের সবচেয়ে মৌলিক বিতর্কটি হলো শরিয়া কি শুধু চুক্তির বাহ্যিক কাঠামো দেখবে, নাকি লেনদেনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করবে?

একটি ‘মুরাবাহা’ বিনিয়োগ তো কাগজে-কলমে ত্রুটিমুক্ত হওয়া যথেষ্ট নয়। ব্যাংক কি সেখানে পণ্যের প্রকৃত মালিকানা অর্জন করেছিল? ব্যাংক কি পণ্য পরিবহনের ঝুঁকি নিয়েছিল? গ্রাহক কি সত্যিই বাস্তব পণ্য গ্রহণ করেছিলেন, নাকি পুরো প্রক্রিয়াটি শুধু অর্থ হস্তান্তরের কৌশল হিসেবে কাজ করেছে? বাস্তবে পণ্য ও মালিকানার সংযোগ না থাকলে ফিকহের ভাষায় সুরত ঠিক থাকলেও তার হাকিকত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

কাতারভিত্তিক হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও শরিয়াহ গবেষক ড. আবদুল আজিম আবু জায়েদ আন্তর্জাতিক শরিয়াহ গভর্ন্যান্স কাঠামোর বাস্তব সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন।

তিনি দেখিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শরিয়াহ গভর্ন্যান্স মূলত তিনটি সংকটে ভুগছে: ১. ফতোয়া প্রদানকারী আলেমদের আধুনিক ব্যাংকিং অপারেশন, আইটি সিস্টেম ও ট্রেজারি বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রায়োগিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা; ২. ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ওপর শরিয়াহ বোর্ডের নীতিগত স্বাধীনতার ঘাটতি; এবং ৩. ফতোয়া অনুমোদনের পর বাস্তব অপারেশনাল ধাপে কার্যকর শরিয়াহ অডিটের দুর্বলতা (ড. আবদুল আজিম আবু জায়েদ, ‘শর্টকামিংস অ্যান্ড প্রপোজড রিফর্মস ইন দ্য এক্সিস্টিং শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্ক ফর ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস’, জার্নাল অব ইসলামিক অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ, ভলিউম ৪, সংখ্যা ১, ২০১৩, পৃষ্ঠা: ৬৬-৮৪)

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জারি করা সাম্প্রতিক শরিয়া গভর্ন্যান্স নীতিমালা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। শরিয়া সুপারভাইজরি কমিটির যোগ্যতার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, কেন্দ্রীয় শরিয়া উপদেষ্টা কাউন্সিল গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ব্যবস্থা দেশের ইসলামি আর্থিক খাতকে আরও কাঠামোগত স্বচ্ছতা দেবে।

ব্যবসায়িক লক্ষ্য বনাম ‘ইহসান’

শরিয়া পরিপালন কোনো স্বতন্ত্র বিভাগের চার দেয়ালে বন্দী রাখার বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা এএওআইএফআই এ জন্যই শরিয়াহ রিভিউ, ইন্টারনাল অডিট, এক্সটারনাল অডিট ও সামগ্রিক গভর্ন্যান্সের ওপর জোর দেয়। (এএওআইএফআই, শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স স্ট্যান্ডার্ডস ফর ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস, মানামাহ: বাহরাইন, ২০২৩)

তবে নীতিমালার বাইরে সবচেয়ে বড় উপাদান হলো তাকওয়া ও ‘ইহসান’-অর্থাৎ জবাবদিহির মানসিকতা। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা পরিহার করো এবং যা সন্দেহমুক্ত, তা গ্রহণ করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৮)

একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শরিয়াকে শুধু ব্যবসায়িক পণ্য অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র বা ‘বাধা’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। হিউম্যান রিসোর্স, ট্রেজারি, আইটি সিস্টেম, ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ও রিকভারি—প্রতিটি বিভাগের কর্মপ্রক্রিয়ায় শরিয়াহর মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমন্বিত না হলে ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের নাম নিছক সাইনবোর্ডেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

পরিশেষ

সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে ইসলামি ব্যাংকিং বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে। তবে বর্তমানের প্রয়োজন পরিমাণগত সম্প্রসারণের চেয়ে গুণগত বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা।

শরিয়া বোর্ডগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা, স্বচ্ছ অডিট ব্যবস্থা এবং বাস্তব সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগ মডেলে ফিরে আসার মাধ্যমেই ইসলামি ব্যাংকিং তার মূল নৈতিক ও মানবিক দর্শনকে পুরোপুরি সার্থক করে তুলতে পারবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com