মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ন
Logo

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক–সংকটে পড়াশোনা ব্যাহত

প্রতিবেদকের নাম / ০ সময় দৃশ্য
আপডেট: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

বর্তমানে ৪৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে গড়ে একজন শিক্ষক পাঠদান করেন। ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে পাঠদানে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকেরা।

শিক্ষক-সংকটে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিবছর শিক্ষার্থী বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি শিক্ষকের সংখ্যা। ফলে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে পাঠদানে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকেরা। বর্তমানে ৪৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে গড়ে একজন শিক্ষক পাঠদান করেন। তবে অর্ধশতাধিক শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে থাকায় এ অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৬৯: ১। সেই সঙ্গে আছে শ্রেণিকক্ষ ও আবাসনসংকট।

উচ্চশিক্ষায় মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশের জন্য ১: ২০ (শিক্ষক-শিক্ষার্থী) অনুপাতকে কাঙ্ক্ষিত বলে শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করে থাকেন। তবে এটি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্ধারিত সর্বজনীন বাধ্যতামূলক অনুপাত নয়।

২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি ছয়টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। সে সময় চারটি অনুষদে ৪০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হন। বর্তমানে ২৫টি বিভাগে স্নাতক এবং ২৪টি বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানায়, বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক ২১০ জন। তাঁদের মধ্যে ৬২ জন শিক্ষা ছুটি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন। নিয়মিত পাঠদান করছেন ১৪৮ জন শিক্ষক। মোট শিক্ষার্থী ১০ হাজার ১৪৫ জন। সে হিসাবে গড়ে ৬৯ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক পাঠদান করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির জনবলকাঠামো অনুযায়ী, অধ্যাপক পদের সংখ্যা ৪৯টি। সেখানে অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন। শিক্ষক পদের সংখ্যা ৪০১টি। এর মধ্যে ইউজিসির অনুমোদন রয়েছে ২৬০টি পদের। বর্তমানে কর্মরত ২১০ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের বিপরীতেও শিক্ষক পদ খালি ৫০টি। শিক্ষক-সংকট শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়; গবেষণা, উচ্চশিক্ষা তত্ত্বাবধান এবং একাডেমিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে।

১৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, একাডেমিক ভবনের নিচতলায় বাংলা বিভাগের সম্মান চতুর্থ বর্ষের একটি ক্লাস চলছিল। সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এ ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে বিভাগটির স্নাতকোত্তর শ্রেণির একটি পরীক্ষা থাকায় নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগেই ক্লাসটি শেষ করা হয়েছে। সেখানে আলাপকালে সম্মান চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাজিব বলেন, কক্ষ–সংকটের কারণে এ রকম প্রতিনিয়তই ঘটছে।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের বিভাগে বর্তমানে সাতটি ব্যাচে চার শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। এত শিক্ষার্থীকে পাঠদান, গবেষণা (থিসিস) ও শিক্ষাবিষয়ক অন্য কাজগুলো করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শিক্ষক–সংকট বেশ ভোগাচ্ছে। এরই মধ্যে ইউজিসিকে বিষয়টি জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে, তারা কিছু শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে।

অধ্যাপক মামুন অর রশিদ, উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষকেরা বলছেন, একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ছাড়াও পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের গবেষণা তত্ত্বাবধান, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও বিভিন্ন কমিটির কাজ করতে হয়। ফলে কাগজে-কলমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত যা দেখা যায়, বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষকের ওপর চাপ আরও বেশি।

প্রয়োজন ৭৫ শ্রেণিকক্ষ, আছে ৩৬টি

বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মৃত্যুঞ্জয় রায়। তিনি জানান, তাঁদের বিভাগের দুটি শ্রেণিকক্ষ আছে। এর একটি নিজ বিভাগের। আরেকটি ভাগাভাগি করতে হয়। প্রতি সেমিস্টারে ৩০ থেকে ৩৫টি ক্লাস থাকে। কক্ষ–সংকটের কারণে তাই নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২৫টি বিভাগের প্রায় ১৫০টি ব্যাচের পাঠদান পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অন্তত ৭৫টি শ্রেণিকক্ষ। এর বিপরীতে আছে ৩৬টি।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, এ ঘাটতির কারণে বিভিন্ন বিভাগকে একই শ্রেণিকক্ষ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এক ব্যাচের ক্লাস শেষ হলে অন্য ব্যাচকে ক্লাস করাতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্লাসের সময় পরিবর্তন করতে হচ্ছে। শিক্ষক-সংকটে একদিকে ক্লাসের চাপ বাড়ছে, আর শ্রেণিকক্ষের অভাবে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস নেওয়া যাচ্ছে না। এর ধারাবাহিক প্রভাব পড়ছে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে চারটি আবাসিক হল আছে। ছাত্রদের জন্য শেরেবাংলা হল ও বিজয়-২৪ হল এবং ছাত্রীদের জন্য সুফিয়া কামাল হল ও রাবেয়া বসরী হল। চারটি হলে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের সুযোগ রয়েছে। মোট শিক্ষার্থীর হিসাব অনুযায়ী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিভাগে মাত্র পাঁচজন শিক্ষক আছেন। এই অল্পসংখ্যক শিক্ষকের পক্ষে পাঁচটি ব্যাচের পাঠদান অসম্ভব। ফলে আমাদের সেশনজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে আমাদের বিভাগ তিন থেকে পাঁচ মাসের সেশনজটে পড়ে গেছে। জানি না, সামনে এটা আরও কত দীর্ঘায়িত হবে। সবকিছু ভেবে এখন নিজেকে অসহায় লাগছে।’

গ্রন্থাগারে আসন ১৩০টি

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের রিডিং রুমেও আছে বড় ধরনের আসনসংকট। সেখানে আসন আছে মাত্র ১৩০টি। মোট শিক্ষার্থী হিসাবে গড়ে ৭৮ শিক্ষার্থীর জন্য একটি আসন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিদিন সকাল থেকেই গ্রন্থাগারে আসন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। পরীক্ষার সময় এই চাপ আরও বেড়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থীকে আসন না পেয়ে ফিরে যেতে হয় অথবা অন্য স্থানে বসে পড়াশোনা করতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনেই পরিচালিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, মেডিকেল সেন্টার ও সমাজকর্ম বিভাগের কার্যক্রম। ফলে একই অবকাঠামোর ওপর একাধিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের চাপ রয়েছে।

হলে আসন ১ হাজার ৮০০

বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে চারটি আবাসিক হল আছে। ছাত্রদের জন্য শেরেবাংলা হল ও বিজয়-২৪ হল এবং ছাত্রীদের জন্য সুফিয়া কামাল হল ও রাবেয়া বসরী হল। চারটি হলে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের সুযোগ রয়েছে। মোট শিক্ষার্থীর হিসাব অনুযায়ী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকি প্রায় ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে ভাড়া বাসা বা মেসে থাকতে হচ্ছে। এতে তাঁদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও যাতায়াত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মেসে ভাড়া থেকে পড়াশোনা করছেন উপমা দত্ত। তিনি বলেন, বাইরে থাকায় তাঁকে আর্থিকভাবে চাপে পড়তে হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকিও আছে। হলে থাকলে একজন শিক্ষার্থীর মাসিক খরচ সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা। সেখানে মেসে সর্বনিম্ন খরচ আট হাজার টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মামুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক–সংকট তাঁদের বেশ ভোগাচ্ছে। এরই মধ্যে ইউজিসিকে বিষয়টি জানিয়ে আবেদন করেছেন, তারা কিছু শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে। অবকাঠামোগত সংকটের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, একাডেমিক ভবনের জন্য ছোট একটি প্রকল্প প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। নতুন অর্থবছরে এটা অনুমোদন পেলে সংকট কিছুটা লাঘব হবে। এ ছাড়া নতুন হল ও অন্যান্য অবকাঠামোর জন্য নতুন একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ করছেন। তবে এটা করতে সময় লাগবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com