শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন
Logo

বরিশালে ডিবির আটক-বাণিজ্য টাকা দিলে মুক্তি, না দিলেই মিথ্যা মামলা!

প্রতিবেদকের নাম / ৮ সময় দৃশ্য
আপডেট: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় এবং টাকা না পেলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বরিশাল জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের বিরুদ্ধে। এই ‘আটক-বাণিজ্যের’ প্রতিবাদ করায় এক ওয়ার্ড বিএনপি নেতার ছেলেকে ১০১ পিস ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই যুবককে তার বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হলেও সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটি স্থানকে ঘটনাস্থল দেখিয়ে মামলার আসামি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই এলাকার ব্যবসায়ী ও খামারিদের কাছে নিয়মিত মাসিক চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা না দিলে অস্ত্র ও মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লাপাড়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী জাফর হাওলাদার।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল জেলা ডিবি পুলিশের এসআই আফজাল ও এএসআই রাজিব পালের নেতৃত্বে মোল্লাপাড়া ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের এই অপকর্মে সহায়তা করছে এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি নয়ন ঢালী ও ভদ্রপাড়ার সাহিন সরদার। এই দুই মাদক কারবারিকে ‘সোর্স’ হিসাবে ব্যবহার করে ডিবির সদস্যরা প্রায় প্রতিদিনই সাদা পোশাকে গ্রামে প্রবেশ করেন। তারা বিভিন্ন মানুষকে আটক করেন এবং দর-কষাকষির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ১১ আগস্ট রাতে মোল্লাপাড়ায় জাফর হাওলাদারের বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। এ সময় তার ছেলে নাদিম, প্রতিবেশী সাব্বির ও সোহাগকে আটক করা হয়। এর আগে একই এলাকার সাহেবের হাট বাজার থেকে নয়ন ঢালী ও সাহিন সরদারকে হাতকড়া পরিয়ে জাফর হাওলাদারের বাড়িতে ধরে আনা হয়েছিল। এই পাঁচজনের মধ্যে জাফর হাওলাদারের ছেলে নাদিমকে ছাড়তে দুই লাখ টাকা এবং বাকিদের প্রত্যেকের জন্য ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশের সোর্স হিসাবে পরিচিত নয়ন ঢালী জানান, ঘটনার রাতে কারও কাছেই কোনো অবৈধ কিছু পাওয়া যায়নি। তাকে সাহেবের হাট থেকে এবং সাহিন সরদারকে ভদ্রপাড়া থেকে হাতকড়া পরিয়ে জাফর হাওলাদারের বাড়িতে আনা হয়েছিল। তার পকেট থেকে ডিবি পুলিশ জোর করে ১২ হাজার টাকা কেড়ে নেয়। পরে বিকাশের মাধ্যমে আরও দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, নাদিমের বিরুদ্ধে ১০১ পিস ইয়াবা উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে আদালতে চালান করে দেন এসআই আফজাল।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার ১ নম্বর সাক্ষী লাল মিয়া বলেন, ‘রাতে বাড়ি ফেরার পথে জাফর ভাইয়ের বাড়ির সামনে ভিড় দেখে এগিয়ে যাই। সেখানে দেখি নাদিমসহ পাঁচজনকে আটকে রাখা হয়েছে। পরে আমরা চারজনকে কোনোমতে ছাড়িয়ে আনি। সাব্বির ও সোহাগের পরিবার ধারদেনা করে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে তাদের মুক্ত করে। কিন্তু নাদিমকে ছাড়াতে পারেনি।’

তিনি আরও জানান, পুলিশ জানিয়েছিল মুরগির খামারি কাওছারকে ধরতে তারা এসেছে। কিন্তু নাদিম তাকে চেনে বলে, পুলিশ তাকেও ধরে নিয়ে যায়। অথচ মোল্লাপাড়া থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরও মামলায় ঘটনাস্থল দেখানো হয়েছে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া। এই দুই স্থানের দূরত্ব সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। একই মামলায় গৌরনদীর আরও দুজনকে আসামি করা হয়েছে। দুটি ভিন্ন অভিযান ও স্থানকে কীভাবে একটি মামলায় একত্র করা হলো, তা বোধগম্য নয়।

মোল্লাপাড়ার কাওছার হোসেন বলেন, ‘এসআই আফজাল ও রাজিব পাল নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে আগেই আমার কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। তারা ফোনে হুমকি দিয়ে প্রতি মাসে চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে অস্ত্র ও মাদক দিয়ে ফাঁসানোর সরাসরি হুমকি দেন তারা।’ ডিবির লোকজন তার ঘরের ভাতের বাটি, গোসল করার সাবান ও গাছের কলা পর্যন্ত জোর করে নিয়ে গেছে অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমানে ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং ডিবি পুলিশ তাকে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

ভুক্তভোগী জাফর হাওলাদার বলেন, ‘পুলিশ আমার দুই ছেলেকে ধরেছিল। এর মধ্যে এক ছেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু নাদিমকে নিয়ে যায়। এসআই আফজাল দুই লাখ টাকা দাবি করেন। আমি টাকা দিতে অস্বীকার করায় তাকে ১০১ পিস ইয়াবা উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে মাহিলাড়ার একটি মামলায় চালান দেয়। অথচ আমার ছেলেকে আমার বাড়ি থেকেই তুলে নেওয়া হয়েছিল।’ তিনি আরও জানান, ডিবি পুলিশের এই হয়রানির কারণে তাদের পুরো গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন রাতে এসে তারা ধরা-বাণিজ্যে লিপ্ত হয়। এ নিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলন ও ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ায় পুলিশ সদস্যরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে তাকেও মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com