শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন
Logo

বরিশাল-ঢাকা নৌ রুট লোকসানে চোখে অন্ধকার দেখছেন লঞ্চ মালিকরা

প্রতিবেদকের নাম / ১৪ সময় দৃশ্য
আপডেট: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

একসময় সন্ধ্যা নামলেই কীর্তনখোলা নদীর তীরে শুরু হতো ব্যস্ততা। একের পর এক বিলাসবহুল লঞ্চের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠত বরিশাল নদীবন্দর, যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকত টার্মিনাল। বরিশাল-ঢাকা নৌপথ ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর চার বছরেই বদলে গেছে সেই চিত্র। যাত্রী সংকটে একের পর এক লঞ্চ বসে থাকছে নদীতে। কেউ বিক্রি করছেন কিংবা ভাঙারির কাছে তুলে দিচ্ছেন। যারা এখনো চালু রেখেছেন, তারাও বলছেন-লোকসানে চোখে অন্ধকার দেখছেন।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৪ সালে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত যাত্রীবাহী প্যাডেল স্টিমার চালু হয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে বেসরকারি মালিকরা এ পথে লঞ্চ নামান। কাঠের ছোট লঞ্চ থেকে তৈরি হয় বিশাল স্টিলবডির বিলাসবহুল লঞ্চ। সেই ধারায় ঢাকা-বরিশাল রুট হয়ে উঠেছিল তিন থেকে চারতলা বিশিষ্ট লঞ্চে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় নৌযাত্রা। একসময় লঞ্চের কেবিনের টিকিট পাওয়া ছিল সোনার হরিণ।

ঈদ মৌসুমে বরিশাল নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই ডজন লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যেত। পদ্মা সেতু চালুর চার বছরেই বদলে গেছে চিত্র। চলতি বছরের ঈদ মৌসুমে নিয়মিত যাত্রী পরিবহণ করেছে মাত্র ৯টি লঞ্চ। একই সময়ে সড়কপথে ৬০টি বাস কোম্পানির অধীনে ৬ শতাধিক বাস বরিশালে প্রবেশ করে। ২০২৫ সালে প্রতিদিন চলেছে মাত্র দুটি করে লঞ্চ। বর্তমানে চলছে তিনটি। কারণ লঞ্চে বরিশাল থেকে ঢাকা যেতে ৯-১০ ঘণ্টা সময় লাগে। ডেক টিকিটের দাম কম হলেও বাস টিকিটের তুলনায় লঞ্চের কেবিনের দাম তুলনামূলক বেশি।

অন্যদিকে সড়কপথে এর অর্ধেকেরও কম সময়ে ঢাকায় পৌঁছান যাত্রীরা। ফলে কম সময় ও খরচে সড়কপথেই যাচ্ছেন তারা। তাছাড়া এসব লঞ্চে আগের মতো যাত্রীসেবার মান নেই। নিম্নমানের খাবার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। এসব কারণে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রীও পাচ্ছেন না মালিকরা।

লঞ্চ মালিকদের হিসাবে, একটি বিলাসবহুল লঞ্চের বরিশাল-ঢাকা-বরিশাল রাউন্ড ট্রিপে সব মিলিয়ে ব্যয় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা। অধিকাংশ ট্রিপে লঞ্চপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। তবুও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে লঞ্চ চালাচ্ছেন অধিকাংশ মালিক।

নৌপথের সংকটের সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ এমভি সুরভী-৭। প্রায় দুই যুগ আগে তৈরি লঞ্চটি বিক্রির জন্য ১২ জুন বিজ্ঞপ্তি দেয় মালিকপক্ষ। ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, লঞ্চটি পরিচালনার জন্য বিক্রি করা হলেও নতুন মালিক তা ঢাকার একটি শিপইয়ার্ডে তুলে ভাঙারি হিসাবে বিক্রি করেছেন।

একসময় ঢাকা-বরিশাল রুটের অন্যতম পরিচিত বিলাসবহুল এ লঞ্চ বিক্রির পেছনে যাত্রী সংকট ও লোকসানকে কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পদ্মা সেতু চালুর পর গত চার বছরে সুরভী-৭ সহ ডজনখানেক বিলাসবহুল লঞ্চ বিক্রি করেছেন মালিকরা। কোনো কোনো লঞ্চ আবার ঢাকার শিপইয়ার্ড বা ডকইয়ার্ডে নিয়ে কেজি দরে ভাঙারিও করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেকার হয়েছেন শত শত ব্যক্তি।

যাত্রী ফেরাতে মালিকরা ভাড়া কমিয়েছিলেন। তিনতলা লঞ্চে ডেকের ভাড়া ৩৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা করা হয়েছিল। চারতলা লঞ্চেও ১০০ টাকা কমানো হয়েছিল। কমানো হয়েছিল ভিআইপি, বিজনেস ক্লাস, কেবিন ও সোফার ভাড়াও। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত যাত্রী ফেরেনি।

ঢাকা-বরিশাল নৌপথে সরকার নির্ধারিত ডেক ভাড়া ৪০৭ টাকা। তবে বছরজুড়ে প্রতিযোগিতা ও যাত্রী সংকটে অনেক সময় ২০০-২৫০ টাকা, এমনকি এর চেয়েও কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহণ করা হচ্ছে। ঈদের সময় আবার সরকারি রেটের কাছাকাছি ভাড়া নেওয়ায় তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।

সব লঞ্চ একসঙ্গে চালালে লোকসান আরও বাড়ে। তাই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে রোটেশন পদ্ধতিতে কিছু লঞ্চ চালু রেখে বাকিগুলো বসিয়ে রাখছেন মালিকরা। নৌপথে যাত্রী কমার প্রভাব পড়েছে লঞ্চ ব্যবসার বাইরেও। বরিশালের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও নেমেছে ধস। কীর্তনখোলা নদী তীরের বড় শিপইয়ার্ডসহ অনেক ডকইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন লঞ্চ তৈরি না হওয়ায় এ শিল্পের সহস্রাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। এক কথায় এই শিল্প বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

লঞ্চযাত্রী শাহ নেওয়াজ বলেন, লঞ্চের সেবা আর আগের মতো নেই। অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় লঞ্চ পরিচালনা করা হচ্ছে। খাবারের মানও আগের মতো নেই।

সুরভী শিপিং লাইনস ও শিপইয়ার্ডের পরিচালক রেজিন উল কবির বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় যাত্রী অনেক কম হওয়ায় লঞ্চ মালিকরা লোকসানে আছেন। যাত্রীসেবার মান বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত যাত্রী মিলছে না। তারপরও ব্যাংক ঋণ মেটানো ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেকারত্ব ঠেকাতে লঞ্চ চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে লঞ্চের সংখ্যা আরও কমবে।

এমভি অ্যাডভেঞ্চার লঞ্চের কেবিন ইনচার্জ জাহিদ বলেন, প্রতি ট্রিপের খরচই অনেক সময় উঠছে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে লঞ্চশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ’র নদীবন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে পন্টুনসহ নদীতে নিরাপদ যাত্রী চলাচলে কাজ করছে বিআইডব্লিউটিএ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবা বাড়িয়ে কম সময়ে ঢাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com