বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৪৩ অপরাহ্ন
Logo

বরিশালে বেহাত সরকারের হাজার কোটি টাকার জমি

প্রতিবেদকের নাম / ০ সময় দৃশ্য
আপডেট: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬

লিজ নেওয়ার পর মামলা দিয়ে দখল

গণপূর্তের জমি দখল করে বাস টার্মিনাল বানাচ্ছে সিটি করপোরেশন * ‘লিজ নিতে পারলেই নানা অজুহাতে মামলা করে জমি দখলে রাখে দুষ্টচক্র’

বরিশালে অযৌক্তিক মামলা দিয়ে দখল করে রাখা হয়েছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। যুগ যুগ চলছে এই প্রক্রিয়া। মামলার কারণে নিজেদের জমি হওয়া সত্ত্বেও তা ব্যবহার করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। কেবল ব্যক্তি নয়, সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও উঠেছে সরকারি দপ্তরের জমি দখলের অভিযোগ। দখলের পর জমির শ্রেণি পালটে খাসজমির অন্তর্ভুক্ত করা এমনকি জাল দলিল বানিয়ে মালিকানা দাবির ঘটনাও ঘটছে। পুরো বিষয়ে মামলা জটিলতা থাকায় চাইলেও কিছুই করতে পারছে না সরকারি দপ্তরগুলো।

১৩ পেট্রোল পাম্পের দখলে সওজের ৩শ কোটি টাকার জমি : ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে ১৩টি পেট্রোল পাম্পের প্রবেশমুখে থাকা সড়ক ও জনপথের ২ একর ৭ শতাংশ জমি নিয়ে ১১ বছর ধরে চলছে মামলা। এসব জমি সড়ক বিভাগের কাছ থেকে শতাংশপ্রতি বছরে মাত্র ৩৩ পয়সা ভাড়ায় লিজ নিয়েছিল পাম্প মালিকরা। ২০১৫ সালে এসব জমির ইজারামূল্য বৃদ্ধি করে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়। মৌজা দরের শতকরা ৭০ ভাগ টাকা দিতে বলা হয় পাম্প মালিকদের। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা মামলা করে। সেই থেকে ১১ বছর চলছে মামলা। বর্ধিত হারে ফি বছর ২০ লাখ টাকা হিসাবে ভাড়া বাবদ পাওনা ২ কোটি ২০ লাখ টাকাও পায়নি সড়ক ও জনপথ। বরিশাল বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংক লরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আকবর বলেন, ‘একতরফা অযৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সড়ক বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলাম। সুরাহা না হওয়ায় মামলা করেছি। এখন আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তাই মেনে নেব।’ পরিচয় না প্রকাশের শর্তে সড়ক বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ‘খুব শিগ্গিরই সমস্যার সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। ইচ্ছা করে বিষয়টিকে দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ফেলে রেখেছেন মালিকরা। আমরা কোনো ভাড়াও পাচ্ছি না। অথচ তারা ঠিকই ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন প্রস্তাবে শতাংশপ্রতি জমির মাসিক ভাড়া চাওয়া হয়েছিল মাত্র ৮০৫ টাকা। তারা তা না দিয়ে মামলা করলেন। এখন ভাড়া না দিয়ে পার করছেন বছরের পর বছর।’ সওজের বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল আলম বলেন, ‘দ্রুত যাতে মামলা শেষ হয়, সেজন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করি, খুব শিগ্গিরই এর সমাধান হবে।’

সবচেয়ে বেশি বেহাত গণপূর্তের জমি : বরিশালে গণপূর্ত অধিদপ্তর কার্যালয়ের অবস্থান ডিসি অফিস সড়কে। এখানে প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ৪০/৪৫ লাখ টাকা। এই সড়কেই বেদখল অবস্থায় গণপূর্তের ১৫ শতাংশ জমি। ২০০৫ সালে ছোট ছোট দোকান হিসাবে এক বছরের জন্য ওই জমি লিজ নিয়েছিলেন স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি। এক বছর পর সেই লিজ আর নবায়ন করেনি গণপূর্ত অধিদপ্তর। ২০০৮ থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তাদের লিজ প্রক্রিয়া। নবায়নের আবেদন অনুমোদন না পাওয়ায় ২০০৭ সালে মামলা করেন লিজ বাতিল হওয়া দুই ব্যক্তি। এরপর ২০ বছর ধরে চলছে সেই মামলা। কেবল এটি নয়, নগরীর বিউটি রোডেও একইভাবে মামলা করে আটকে রাখা হয়েছে ৪০ শতাংশ জমি। শতাংশপ্রতি ৫০ লাখ টাকারও বেশি মূল্যের এই জমি নিয়ে কেবল মামলাই নয়, দলিল বানিয়ে মালিকানা পর্যন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। একইভাবে তালতলি এলাকায় ৯ একর, গড়িয়ার পাড় এলাকায় ১১ একর, কীর্তনখোলা নদীর পূর্বপাড়ে ৮ একর এবং বাকেরগঞ্জ উপজেলায় ৫ একর জমির দখল পাচ্ছে না গণপূর্ত অধিদপ্তর। এসব জমির বাজার মূল্য ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। গড়িয়ার পাড় এলাকায় গণপূর্তের জমির বেশ বড় একটা অংশ দখল করে বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ করছে বরিশাল সিটি করপোরেশন। অথচ ওই জমি দখলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি বা বৈধ কোনো দাপ্তরিক কার্যক্রম তারা করেনি। গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আবেদিন বলেন, ‘যেসব জমির কথা বলা হচ্ছে তার সবকটি নিয়েই মামলা চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিজ বাতিল হওয়ার পর মামলা করে জমিগুলো অবৈধ দখলে রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে যোগাযোগ করেছি। আশা করি, শিগ্গিরই এসব জমির দখল বুঝে পাব।’

দখলে আটকা ৭ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প : নগরীর ব্যস্ততম পোর্ট রোড এলাকায় বহু বছর আগে বিআইডব্লিউটিএ-এর কাছ থেকে ৪ শতাংশ জমি লিজ নিয়েছিলেন কয়েকজন ব্যক্তি। ইলিশ মোকামসংলগ্ন ওই জমির বর্তমান বাজার দর প্রতি শতাংশ ৫০ লাখ টাকা। অন্যতম বাণিজ্যিক এই এলাকায় সড়ক প্রশস্তের প্রয়োজনে বেশ কয়েক বছর আগে লিজ নবায়ন বন্ধ করে দেয় বিআইডব্লিউটিএ। নবায়ন করতে না পেরে টিএ-এর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন লিজ বাতিল হওয়া গ্রহীতারা। সেই থেকে একদিকে যেমন চলছে মামলা, অন্যদিকে আটকে আছে সড়কের উন্নয়নকাজ। সম্প্রতি এই সড়কের উন্নয়ন ও ড্রেন নির্মাণে ৭ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় বিআইডব্লিউটিএ। তবে প্রকল্পের সেই ড্রেন আটকে গেছে আলোচ্য জমিতে। মামলা জটিলতায় আটকে থাকা ওই জমি বাদ দিয়ে দুই পাশে ড্রেন করে সংযোগ দেওয়া ছাড়াই কাজ শেষ করছে বিআইডব্লিউটিএ। এ বিষয়ে বরিশালের বন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মামলা জটিলতার কারণে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। জটিলতা কাটলে আমরা ড্রেনের সংযোগ দেব।’

কেবল গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ বা বিআইডব্লিউটিএ নয়, জেলা পরিষদ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ অন্য দপ্তরগুলোরও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বছরের পর বছর পড়ে আছে অবৈধ দখলের কবলে। বরিশালের জেলা পরিষদ প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘একবার লিজ নিতে পারলেই নানা অজুহাতে মামলা করে জমি দখলে রাখে দুষ্টচক্র। আমরা উদ্যোগ নিয়েছি এসব জমি দখলমুক্ত করার। এতদিন পরিচর্যার অভাবে মামলাগুলো যুগ যুগ ঝুলে ছিল। সেই পরিচর্যার কাজটি আমরা শুরু করেছি। আশা করি, শিগ্গিরই অবৈধ দখলে থাকা সব জমি দখলমুক্ত করতে আমরা সক্ষম হব।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com