সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১১ অপরাহ্ন
Logo

গভীর আর্থিক সংকটে জাতিসংঘ, কঠিন পরীক্ষায় খলিলুর রহমান

প্রতিবেদকের নাম / ৩ সময় দৃশ্য
আপডেট: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও উন্নয়নের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘই এখন গভীর আর্থিক সংকটে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে নির্ধারিত চাঁদা সময়মতো না পাওয়া, বিপুল বকেয়া এবং অর্থের সংকটে সংস্থাটিকে ব্যয় সংকোচন ও কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটতে হচ্ছে। কমানো হচ্ছে কর্মী ও বিভিন্ন কার্যক্রমের ব্যয়। এরই মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। ফলে সংকটের এই সময়ে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও আস্থাশীল করার উদ্যোগে বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘের ‘ইউএন৮০ উদ্যোগ’-এর জুন ২০২৬-এর অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতিসংঘ সচিবালয়ের নির্ধারিত চাঁদার বকেয়া ছিল ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ চার বছরে বকেয়া বেড়েছে প্রায় ৯৪ শতাংশ। এই বকেয়ার মধ্যে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অর্থও রয়েছে।

অর্থসংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটে। সাধারণ পরিষদ ২০২৬ সালের জন্য ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের নিয়মিত বাজেট অনুমোদন করেছে। ২০২৫ সালের অনুমোদিত বাজেটের তুলনায় এটি প্রায় ৭ শতাংশ কম। একই সঙ্গে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের শুরুতে ২ হাজার ৯০০টি পদ বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে এক হাজারের বেশি কর্মীর চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।

জাতিসংঘ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনা, কৌশল, নীতি ও বিধি মেনে চলাবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জুলাইয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, সচিবালয়ের ব্যয় ৯ দশমিক ২ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে এই ৯ দশমিক ২ শতাংশকে জাতিসংঘের সামগ্রিক নিয়মিত বাজেট কমার হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৭ সালের বাজেটে একই মাত্রায় আরেক দফা কাটছাঁটের পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি জানান।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের আর্থিক সংকটের কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নির্ধারিত আর্থিক দায় যথাসময়ে পরিশোধ না করা।

 

জাতিসংঘের অর্থসংকট শুধু বকেয়া চাঁদার কারণে নয়। ‘ইউএন৮০ উদ্যোগ’-এর নথিতে বলা হয়েছে, নিয়মিত বাজেট পরিচালনায় গুরুতর নগদ অর্থসংকট তৈরি হয়েছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নির্ধারিত চাঁদা সময়মতো ও পূর্ণাঙ্গভাবে না পাওয়া এর অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি স্বেচ্ছা অনুদানের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অর্থসংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

সংকট সামাল দিতে গত জুনে সাধারণ পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নেয়। জাতিসংঘের তৎকালীন সাধারণ পরিষদ সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক জানান, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং নিয়মিত বাজেটের প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে ফেরত দেওয়ার চাপ থেকে মুক্ত থাকবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এ সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের আর্থিক সমস্যার মূল কারণ দূর করেনি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সময়মতো ও পূর্ণাঙ্গ অর্থ প্রদান জরুরি।

এমন বাস্তবতার মধ্যেই ৯ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। বাংলাদেশের খলিলুর রহমান নতুন অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তার ঘোষিত বছরের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খলিলুর রহমানের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু, মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা, ডিজিটাল শাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কার। ফলে অর্থসংকটের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া তাঁর সভাপতিত্বের অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতিসংঘের ‘ইউএন৮০ উদ্যোগ’-এর আওতায় প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, কাজের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং সীমিত সম্পদকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরের কাজ ও কাঠামো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে কর্মীসংখ্যা কমানো এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের ওপর এর প্রভাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত সম্পদের মধ্যে সংস্থার কার্যক্রম আরও কার্যকর করাই সংস্কারের লক্ষ্য।

এদিকে চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। জাতিসংঘের চাঁদা নির্ধারণবিষয়ক কমিটির সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪০টি ২০২৬ সালের নিয়মিত বাজেটের নির্ধারিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেছে। এখনো ৫৩টি সদস্যরাষ্ট্র তাদের নির্ধারিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেনি।

সব মিলিয়ে ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন জাতিসংঘকে একই সঙ্গে অর্থসংকট, সংস্কারের চাপ এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থার প্রশ্ন মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি সংস্থাটির কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে ৮১তম অধিবেশনে জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ কাঠামো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সংস্কার নিয়ে আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com