বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫২ অপরাহ্ন
Logo

পরাশক্তিগুলোর অনুধাবন করা উচিত, ক্ষমতা অসীম নয়: গুতেরেস

প্রতিবেদকের নাম / ৩ সময় দৃশ্য
আপডেট: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বৈশ্বিক সংকটের গভীর ফাটলগুলো এখন অতল খাদে পরিণত হয়েছে। আর পরাশক্তিগুলো প্রমাণ করেছে, একা সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে বৈশ্বিক সংকট সমাধান সম্ভব নয়।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে এ কথা বলেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

হতাশায় ঘেরা ওই ভাষণে ৭৭ বছর বয়সী পর্তুগিজ এ কূটনীতিক বলেন, ‘আমার ১০ বছরের দায়িত্বকালে বিশ্বজুড়ে ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিয়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, তা দীর্ঘায়িত হয়েছে। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। মানবাধিকার পদদলিত হয়েছে। ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেবাদানকারীরা প্রাণ হারিয়েছেন। আর আন্তর্জাতিক আইন ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলা হয়েছে।’

গুতেরেস বলেন, ‘ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। বৈষম্য তীব্র রূপ নিয়েছে। ধসে পড়েছে পারস্পরিক আস্থা। জলবায়ু সংকট এখন আর দূরবর্তী কোনো সতর্কবার্তা নয়, প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এমন অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে চলেছে, যা নির্মাতাদেরও দিশেহারা করে দিয়েছে।’

ইসরায়েলের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করে তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আক্রমণের পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন এক হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে, যা মহাসচিব হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনকালে আগে দেখিনি।’

পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস মনে করেন, পুনর্গঠিত ও সর্বজনীন জাতিসংঘের অধীনে নতুন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাই কেবল বর্তমান সংকট মোকাবিলার একমাত্র পথ। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘মানবজাতি যখন অভূতপূর্ব এক সংকটের মুখোমুখি, ঠিক তখন আমাদের সম্মিলিত সুরক্ষাকাঠামো মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম না নিয়ে গুতেরেস বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পরাশক্তিগুলোর এখন অনুধাবন করা উচিত, তাদের ক্ষমতা আসলে অসীম নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে- কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে শান্তি নিশ্চিত করা যায় না, অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে স্থিতিশীলতা আনা যায় না। কেবল প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।’

ভাষণে বিশ্ব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ব্লকে বিভক্তি এবং আধিপত্যবাদী প্রবণতা এড়ানোর ওপর জোর দেন গুতেরেস। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ হলো- ক্ষমতার কাঠামো যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, শাসনব্যবস্থা তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। রাষ্ট্রগুলোর হাত থেকে ক্ষমতার স্থানান্তর ঘটেছে গুটিকয়েক বেসরকারি কর্পোরেশন ও ধনকুবের ব্যক্তির হাতে। রাজনীতি, অর্থনীতি, তথ্যের প্রবাহ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি নাগরিক পরিসরে তাদের প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে। মানুষ দিন দিন যন্ত্রের হাতে ক্ষমতা সঁপে দিচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টরা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির অস্ত্র এখন সামরিক সত্যে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে গুতেরেস প্রশ্ন তোলেন— বিশ্ব কি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আর সঙ্কুচিত সহযোগিতার মাধ্যমে আরও বিভক্ত হবে, নাকি জাতিসংঘের নেতৃত্বে এক সুষম বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দিকে মোড় নেবে?

তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে আসল পরীক্ষা হলো, ক্ষমতা কী আইনের অধীনে পরিচালিত হবে, নাকি আইনের বাইরে? দ্বিমুখী নীতি বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সনদ রক্ষা এবং ব্যতিক্রম ছাড়া বেসামরিক সব মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ত্রাণ সরবরাহের পথ উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়ে মনে করিয়ে দেন- গাজায় জাতিসংঘকে কাজ করতে দেওয়ার জন্য গত বছর আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)।

গুতেরেস বলেন, ‘অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ ও ইহুদি বসতি স্থাপন শান্তির পথকে গুড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিগত নিধনের ভয়াবহ শঙ্কা তৈরি করছে। চোখের সামনে এই সংকটের সমাধান বিলীন হতে দেওয়া যায় না।’

ইউক্রেন প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, ‘রাশিয়ার আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়ে একটি স্বাধীন দেশের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। এখন রাশিয়ার কিছু অঞ্চলে ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর হামলা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলাকে হুমকির মুখে ফেলছে।’

২১ শতকের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে ‘অন্যায়’ আখ্যা দিয়ে গুতেরেস বলেন, ‘তহবিল সংকট ও নানা সমালোচনার মধ্যেও জাতিসংঘই একমাত্র জায়গা যেখানে শক্তিশালী পক্ষগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।’ জাতিসংঘের ইতিহাসে এই প্রথম শীর্ষ নেতৃত্ব, প্রধান কার্যালয় ও পেশাদার পদে পুরুষের পাশাপাশি সমসংখ্যক নারী নিয়োগ নিশ্চিত করা গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

‘সমতা কোনো স্বপ্ন নয়, এটি একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করে গুতেরেস বলেন ‘জাতিসংঘ যদি বদলে যেতে পারে, তবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পার্লামেন্ট, সরকার ও শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়াতেও বদল সম্ভব।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com