বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ন
Logo

বিশ্ব হার্ট দিবস !!ওষুধের মজুত শেষ, ঝুঁকিতে ১৫ লাখ নিবন্ধিত রোগী

প্রতিবেদকের নাম / ১৭ সময় দৃশ্য
আপডেট: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খাচ্ছেন ফাতিমা বেগম। প্রতি মাসে জামালপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) কর্নার থেকে এক মাসের ওষুধ বিনামূল্যে নিতেন ৩২ বছর বয়সী এই গৃহবধূ। তবে গত মাসে সেখানে গিয়ে ওষুধ না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাঁকে। কর্নার থেকে জানানো হয়, ওষুধের মজুত শেষ।

একই অবস্থা ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী করীম আলীর। তিনিও উচ্চ রক্তচাপের রোগী। তিনি জানান, কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আগে এক মাসের ওষুধ পেতাম। এখন মাত্র ১০ দিনের ওষুধ দেয়। বাকি ওষুধ ফার্মেসি থেকে কিনতে হবে। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলাম, কিন্তু ওষুধ সংকট আমাকে বিপদে ফেলেছে।

দেশের ৪৪৬ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারে এখন এমনই পরিস্থিতি। খোদ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্যই বলছে, প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সরকারের সরবরাহ করা পাঁচ ধরনের ওষুধের মধ্যে কোনো না কোনোটির ঘাটতি রয়েছে। যেসব ওষুধ রয়েছে সেগুলোও আগামী অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে। সমকাল দেশের ১০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য নিয়েও ওষুধ সংকটের সত্যতা পেয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার নানা কর্মসূচিতে পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘একটি স্পন্দনও যেন মিস না হয়’। আজ রাজধানীর একটি হোটেলে হৃদরোগ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আলোচনা সভায় আয়োজন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সালে এনসিডি কর্নার কর্মসূচি চালু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বর্তমানে ৪৪৬ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৩০ জেলা হাসপাতালে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা হয়। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ করা পাঁচ ধরনের ওষুধও রোগীকে বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ আটটি সংস্থা এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

এনসিডি কর্নারে ১৪ লাখ ৮০ হাজার ১১৭ জন রোগী নিবন্ধিত। তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের রোগী ১১ লাখ ৩১ হাজার ৪৮৭ এবং ডায়াবেটিসের রোগী আট লাখ ৯৬ হাজার ২৯৩। নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার ফলে ৬১ শতাংশ রোগীর ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ বলেন, এনসিডি কর্মসূচির অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোকে অন্য ওষুধের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ করা পাঁচটি ওষুধও কিনতে বলা হয়েছে। কিন্তু উপজেলা হাসপাতালের বাজেট সীমিত। এসব ওষুধ কিনতে গেলে অন্য ওষুধের সংকট আরও বাড়তে পারে। ঠিক কতটি এনসিডি কর্নারে ওষুধের সংকট রয়েছে, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই বলেও জানান তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৬ মার্চ জরুরি ভিত্তিতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়েছিল, মজুত থাকা ওষুধ ৬০ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তবে এরপর প্রায় সাড়ে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও ওই অর্থের বরাদ্দ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অধ্যাপক হালিমুর রশীদ বলেন, ওষুধ কেনার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে দেশের হাসপাতালগুলোর জন্য বরাদ্দ বাড়তে পারে। আলাদা করে এনসিডি কর্মসূচির জন্য অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে হাসপাতালগুলোকে নিজেদের উদ্যোগে ওষুধ কেনার সুযোগ দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। ফলে রোগীর ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে চিকিৎসকরা উদ্বিগ্ন।

চিকিৎসকরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দরিদ্র রোগীর নিজের টাকায় ওষুধ কিনতে হবে। অনেকের ক্ষেত্রে চিকিৎসা অনিয়মিত বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে দীর্ঘদিনের চিকিৎসার সুফল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হৃদরোগ ও জটিলতার ঝুঁকি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
হালিমুর রশীদ অবশ্য মনে করেন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের প্রায় ৭০ শতাংশ রোগী এমনিতেই নিজেদের টাকায় ওষুধ কেনেন। এনসিডি কর্নারের সেবায় বিঘ্নের কারণে এ হার সর্বোচ্চ আরও ৫ শতাংশ বাড়তে পারে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই বাড়তি বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপের ওষুধে ব্যয় করা হলে দেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হৃদরোগে 
দেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাভাবিক মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ হৃদরোগ, যা প্রতি ১০০ জনের বিপরীতে ৩৬ জন। তবে ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে হৃদরোগের বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের বাংলাদেশ কান্ট্রি প্রোফাইলে আইএইচএমইর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদরোগে চার লাখ ১৫ হাজার ২৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে এ রোগে মৃত্যুহার ২৩৫। বয়স সমন্বিত মৃত্যুহার ৩৭১ এবং নতুন রোগের বয়স সমন্বিত হার প্রতি লাখে ৫৯৪। তবে হৃদরক্তনালির রোগের মধ্যে হৃদরোগ ও রক্তনালির বিভিন্ন রোগ অন্তর্ভুক্ত। ফলে শুধু হৃদরোগে বছরে ঠিক কত মানুষ আক্রান্ত হন বা মারা যান, তার পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশভিত্তিক সর্বশেষ কারণভিত্তিক মৃত্যুর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে হৃদরোগে প্রতি লাখে ৫৮ দশমিক পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ৬৭ দশমিক ৬ এবং নারীর ক্ষেত্রে ৫০ দশমিক ২। ওই বছর স্ট্রোকের পর হৃদরোগ ছিল দেশের দ্বিতীয় প্রধান মৃত্যুর কারণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com