সরকার দলের নেতাকর্মী বা দলীয় পরিচয়ে যারা চাঁদাবাজি, দখল ও অপরাধমূলক কাজে জড়াচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতামত নিতে হবে না। অপরাধে সম্পৃক্ত হলেই গ্রেপ্তার করা হবে; দলীয় পদ বা পরিচয় দেখা হবে না।
গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদরদপ্তরে অপরাধ পর্যালোচনা সভা থেকে মাঠ পর্যায়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সভায় ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, ৬৪ জেলার এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা সশরীরে ও ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির সভায় বক্তৃতা করেন। এতে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান।
সভায় জানানো হয়, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনে মামলা নেবে পুলিশ। এমন নির্দেশনা দিয়ে সোমবার সারাদেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কুইক রেসপন্স টিমের (কিউআরটি) পরিধি বাড়ানো হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়। গতকাল সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানিয়েছে।
ঢাকার মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি-বাড়ি দখলচেষ্টা, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত এ অপরাধ পর্যালোচনা সভা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
অপরাধ করলেই গ্রেপ্তার
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সভা থেকে কর্মকর্তাদের অপরাধমূলক কাজে জড়িত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতামত নিতে হবে না– এমন বার্তা দেওয়া হয়। তবে কোনো বিশেষ ঘটনায় যদি মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেন, তা দ্রুত করতে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় শাহ আলী থানার ওসি জানার পরও ব্যবস্থা নেননি। পুলিশের সামনে লুটের মালপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার আদাবর এলাকায় আটতলা একটি বাড়ি দখলের চেষ্টার সময় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানানোর প্রায় ৩ ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক এসব ঘটনা বিবেচনা করে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তর জানায়, গতকালের বৈঠকে পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির বলেছেন, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধী। মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের শূন্য সহনশীলতার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে পুলিশপ্রধান বলেন, এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
সভায় অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) সায়েদুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এদের পেছনে কোনো প্রভাবশালী রয়েছে কিনা, তা উদ্ঘাটন করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের যথাযথভাবে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশ দেন।
মাঠ প্রশাসনের উদ্দেশে দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার জন্য পুলিশ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান সায়েদুর রহমান।
জমির মামলা নেবে পুলিশ
জমি নিয়ে দখল-পাল্টা দখলের ঘটনায় সংঘাত, সহিসংতা ঘটছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত ফৌজদারি অপরাধের মামলা হয়। সংঘাত নিয়ন্ত্রণে এখন থেকে জমি-সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে আগেভাগে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রয়োগ করে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের সব ইউনিটকে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর।
২০২৩ সালে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনটি পাস হয়। এর মূল উদ্দেশ্য নাগরিক, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভূমির দখল ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভূমি-সংক্রান্ত জালিয়াতি ও অবৈধ দখল রোধ করা। এই আইনের কিছু ধারার মধ্যে আছে অন্যের ভূমি নিজের বলে প্রচার করা, মালিকানার তথ্য গোপন করে সম্পত্তি হস্তান্তর করা, কিংবা মিথ্যা দলিল তৈরি করা। বৈধ খতিয়ান, রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বা আদালতের আদেশ ছাড়া কোনো ভূমি জোরপূর্বক দখলে রাখা বা বৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা।
এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধগুলো আমলযোগ্য হওয়ায় সরাসরি থানায় মামলা বা এজাহার দায়ের করা যাবে। তবে আইনটি খুব একটা প্রয়োগ করে না পুলিশ। সম্প্রতি জমি, বাড়ি দখল ঘিরে বেশ কিছু সহিংস ঘটনার পর প্রয়োজন হলে এই আইনে মামলা নিতে বলা হয়েছে।
কিউআরটির পরিসর বৃদ্ধি
সভার সূত্র বলছে, সপ্তাহখানেক আগে ডিআইজিদের নেতৃত্বে সব রেঞ্জে কুইক রেসপন্স টিম বা কিউআরটি গঠন করা হয়। এতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বা বিলুপ্ত র্যাব, রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ), নৌ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব সংস্থার প্রধানরা আছেন। কোথাও আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে তাদের যৌথভাবে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ঢাকায় ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি) নামে বিশেষ ইউনিট কাজ করত। এ ছাড়া মহানগর এলাকায় দ্রুত অপরাধ দমনে বিশেষ টিম আছে। এখন মহানগরের বাইরেও এই ধরনের টিম পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজির আওতায় কাজ করবে।
কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক দমনে ‘ভিন্ন’ ধরনের একটি বড় অভিযানের চিন্তা কিছু দিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনায় ছিল। ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে এই ধরনের বড় অভিযানের বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সবুজ সংকেত পেলে পরবর্তী পথরেখা চূড়ান্ত করা হবে।
তবে গতকাল পুলিশের সভা থেকে বলা হয়েছে, অস্ত্র উদ্ধার, কিশোর গ্যাং ও মাদককারবারি, চাঁদাবাজদের ধরতে একটি বিশেষ অভিযান দেশব্যাপী চলমান। সেই অভিযান আরও জোরদার করতে বলা হয়েছে।
পুলিশের একজন ডিআইজি সমকালকে বলেন, রেঞ্জ পর্যায়ে কিউআরটি গঠনের সিদ্ধান্ত সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে। এরপর বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় বৈঠক হয়েছে। যৌথ অভিযানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে কিউআরটি প্রস্তুত আছে। তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগেভাগে পরিকল্পনা করে কিউআরটি অপারেশন চালাবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দখল, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে কারা কোন পরিচয়ে জড়িত এই তালিকা জেলা ও মহানগরভিত্তিক করা হয়েছে। নতুনভাবে কারও নাম এলে তালিকায় তা যুক্ত হচ্ছে।