সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন কীভাবে ফাঁস হয়েছে, তা খুঁজছে সরকার। গতকাল শনিবার রাত পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, রাজধানীর দিলকুশায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের একটি কক্ষে সারারাত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপানোর কাজ চলে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই কক্ষেই ছিলেন।
সূত্রগুলো জানায়, ওই কক্ষে ছিলেন নিয়োগ কমিটির পাঁচ সদস্য। তারাই মূলত প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। তাদের কাজে সহায়তা করার জন্য কক্ষটিতে ছিলেন ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ২০ জন কর্মী। তাদের সবার মোবাইল ফোন আগেই নিয়ে নেওয়া হয়, বন্ধ রাখা হয় ইন্টারনেট সংযোগও। এর পরও রাতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। শেষ পর্যন্ত স্থগিত করতে হয় পরীক্ষা।
প্রশ্ন উঠেছে, এত কড়াকড়ির মধ্যেও প্রশ্নপত্র বাইরে গেল কীভাবে? নিয়োগ কমিটির সদস্য, নাকি প্রশ্নপত্র ছাপানোর কাজে যুক্ত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কর্মী– কার মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে? নাকি অন্য কোনো দুর্বলতা ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিয়োগ কমিটির পাঁচ সদস্য এবং ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ওএমআরডিএম সিস্টেমের কর্মীদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। তদন্তে সহায়তার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) যুক্ত করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা করেছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন সমকালকে বলেন, প্রধান কার্যালয় থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়েছিল। নিয়োগ কমিটির সদস্যদের সঙ্গে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী কাজ করেছেন। তাদের কেউ এ ঘটনায় জড়িত কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সিআইডি জবানবন্দি নিচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তদন্তে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া সমকালকে বলেন, এ পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাই শুধু প্রশাসনিক তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; ফৌজদারি মামলা করে অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তদন্ত করতে পারে। তিনি বলেন, যারা দায়ী, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাই সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা জরুরি।
নিরাপত্তা কতটা কার্যকর ছিল
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র আগাম তৈরি না করে পরীক্ষার আগের রাতে প্রস্তুত, মুদ্রণ ও প্যাকেট করা হয়। প্রশ্নপত্র তৈরির কাজে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।
নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ও যুগ্ম সচিব ডি এম আতিকুর রহমান। সদস্য সচিব ছিলেন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন-১) আতিকুর রহমান। অন্য সদস্যরা হলেন– যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজানুর রহমান এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্ম কমিশনের দুজন প্রতিনিধি। তাদের নাম তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
বহুনির্বাচনী বা এমসিকিউ পদ্ধতির এই পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন বা ওএমআর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর জন্য একটি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। এর নাম ওএমআরডিএম সিস্টেম। প্রতিষ্ঠানটির মালিকের নাম জহাদুর রহমান।
প্রশ্নপত্র প্রস্তুত ও মুদ্রণের কাজে কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি এই ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জহাদুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘আমরা কর্মী দিতে চাইনি। অধিদপ্তর আমাদের কাছে লোক চেয়ে নিয়েছে। এ জন্য চুক্তিপত্রে ফটোকপি মেশিনের অপারেটর ও বাইন্ডিংয়ের জন্য আলাদা লোক দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।’ তিনি বলেন, কর্মীরা শুক্রবার সন্ধ্যায় অধিদপ্তরে গেছে। এর পর রাত ১০টায় তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয় এবং কক্ষে প্রবেশ করানো হয়। এখনও (গতরাত ১২টা) তারা সেখানে অবস্থান করছে।’
সূত্র জানায়, প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপানোর জন্য নির্ধারিত কক্ষে ১২টি হাইস্পিড ফটোকপি মেশিন ও একটি ল্যাপটপ ছিল। ফটোকপি মেশিনগুলো সরবরাহ করেছিল ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান। আর ল্যাপটপটি ছিল অধিদপ্তরের নিজস্ব। ওই সময় অধিদপ্তরের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ছিল। প্রশ্নপত্র ছাপানো, ফটোকপি মেশিন পরিচালনা ও প্রশ্নপত্র বাঁধাইয়ের কাজে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ২০ জন কর্মী ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ১২ জন মেশিন অপারেটর ও আটজন বাইন্ডার। মেশিন অপারেটরের নেতৃত্বে ছিলেন সালাম।
প্রশ্নপত্রের যে ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে মনে হচ্ছে, কেউ একজন হাতের ওপর রেখে প্রশ্নপত্রের ছবিটি তুলেছেন। ছবিতে আঙুলের সামান্য অংশ আছে বলে মনে হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এখন ওই আঙুল এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করছে ।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম সমকালকে বলেন, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রথমে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তিনি বলেন, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার উত্তরপত্র ওএমআর পদ্ধতিতে যন্ত্রের মাধ্যমে মূল্যায়নের জন্য দরপত্রের মাধ্যমে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না।
সচিব বলেন, প্রশ্নপত্র তৈরি, কম্পিউটারে টাইপ, মুদ্রণ ও প্যাকেটজাত করার কাজ একটি কক্ষে করা হয়। হাইস্পিড ফটোকপি মেশিনে প্রশ্ন ছাপানো হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কক্ষের বাইরে যাতায়াতও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। এত সতর্কতার পরও কীভাবে প্রশ্ন ফাঁস হলো, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার বিধান বাতিল হয়েছিল কেন
২০২০ সালের আগে সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংস্থার নিয়োগ পরীক্ষা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হতো। এসব প্রতিষ্ঠানকে সাধারণভাবে তৃতীয় পক্ষ বলা হয়।
এ ব্যবস্থায় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ পদের চাহিদা নির্ধারণ, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, যোগ্যতা যাচাই, ফল অনুমোদন ও নিয়োগপত্র দেওয়ার দায়িত্ব পালন করত। আর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা আয়োজন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন বা মুদ্রণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফল প্রস্তুতের কাজ করত।
তবে ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নেওয়ার বিধান বাতিল করে। বাড়তি ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর কথা বলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি, তিন কর্মদিবসে প্রতিবেদন
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন– যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন যুগ্ম সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন পরিচালক। যুব মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন অধিশাখা) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
অফিস আদেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্ত করে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটিকে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য গঠিত কমিটির সদস্য, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ সহায়তাকারীদের বক্তব্য নিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে কমিটি নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থগিত হওয়া সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষা ১৬ অক্টোবর শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে। বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় পরীক্ষা নেওয়া হবে।