ডেঙ্গু আক্রান্ত পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির সোহাগদল গ্রামের কিশোর মো. ইয়াসিন। তার পাশেই আরেক রোগী শারমিন আক্তার। তাঁর বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলায়। দুজনই হাসপাতালের প্রবেশপথের মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীর চাপের কারণে শয্যা না পাওয়ায় তাদের মতো আরেও অন্তত ৫০ জনকে গাদাগাদি করে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এই চিত্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের। গতকাল শনিবার হাসপাতাল ভবনের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই ইয়াসিন ও শারমিনের দেখা মেলে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ও অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আসা সব রোগীকেই মেঝেতে একসঙ্গে রাখা হচ্ছে। শয্যা সংকটে ডেঙ্গু রোগীকে আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা নেই। তাদের জন্য মশারিরও ব্যবস্থা নেই।
শারিমন প্রসব-পরবর্তী রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। মেডিসিন ইউনিট-৬-এর অধীনে তিনিসহ অন্যদের চিকিৎসা চলছে। তিনি সমকালকে বলেন, শুক্রবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি হন। শয্যা না থাকায় মেঝেতে রাখা হয়। পরে জানতে পারেন, তাঁর পাশের ছেলেটি ডেঙ্গু আক্রান্ত। তিনি বলেন, ‘এক রোগের চিকিৎসা নিতে আইয়া আবার ডেঙ্গু না হইয়া যায়। খুব ভয়ে আছি। এমনিতেই চিকিৎসা লইয়া চাপে আছি।’
খোলা জায়গায় মশারি ছাড়া ডেঙ্গু রোগী থাকায় শারমিনের মতোই আতঙ্কের কথা বলেছেন আরও কয়েকজন রোগী ও স্বজন। কয়েকজন রোগী জানান, হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়মিত পান না। আবার ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হয়। এ নিয়ে তারা ক্ষুব্ধ। আলমগীর হোসেন নামে এক রোগীর স্বজন জানান, শুধু কম দামের কিছু ওষুধ হাসপাতাল থেকে দেওয়া হয়। বাকি সব ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, প্রধান ভবনের হাঁটার পথ, লিফট ও শৌচাগারে যাওয়ার রাস্তা– কোথাও ফাঁকা নেই। অতিরিক্ত রোগীর চাপে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও আলাদা করা যাচ্ছে না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান এই চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও জনবল কাঠামো ৫০০ শয্যার উপযোগী। কয়েক বছর আগে হাসপাতালটিকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হলেও জনবল কাঠামো বাড়ানো হয়নি। অথচ প্রতিদিন হাসপাতালে প্রায় তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এ ছাড়া বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন আরও গড়ে সাড়ে তিন হাজার রোগী। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে সেবার মান বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনকেও।
হাসপাতালের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৮১০। ১ থেকে ৯ অক্টোবরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই সময়ে প্রতিদিনই ভর্তি রোগীর সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি ছিল। ৫ অক্টোবর সর্বোচ্চ দুই হাজার ৯০৪ রোগী ভর্তি ছিলেন। ১ অক্টোবর এ সংখ্যা ছিল সর্বনিম্ন দুই হাজার ৬০৭।
এমআইএস দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩৯। নার্সরা জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ৩০টি। তবে বাড়তি রোগীর চাপ থাকায় সবাইকে আলাদা রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
সেবা দিতে হিমশিম চিকিৎসকদের
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসকের ৩২৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৩৬ জন। অর্থাৎ, চিকিৎসকের ৮৭টি পদ শূন্য। অন্যদিকে, নার্সের এক হাজার ৬২টি পদের বিপরীতে কর্মরত এক হাজার চারজন। ফলে চিকিৎসক ও নার্স– দুই ক্ষেত্রেই জনবলের ঘাটতি রয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি থাকা দুই হাজার ৮১০ রোগীর বিপরীতে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা হিসাব করলে প্রতি ১২ রোগীর বিপরীতে একজন চিকিৎসক পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসকরা আট ঘণ্টার শিফটে দায়িত্ব পালন করেন। কারণ, চিকিৎসকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ছুটিতেও থাকেন। ফলে প্রতি শিফটে দায়িত্ব পালনরত একজন চিকিৎসককে অনেক বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের জন্য প্রণীত ২০১৭ সালের নীতিমালায় প্রতি শিফটে ১০ রোগীর বিপরীতে একজন চিকিৎসক, দুজন নার্স ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখার বিধানের কথা বলা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন ১০ রোগীর বিপরীতে তিনজন চিকিৎসক, ছয়জন নার্স ও তিনজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দায়িত্ব পালনের কথা।
এ বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, সরকারি হাসপাতালের জন্যও একই ধরনের নীতিমালা হওয়ার কথা। তবে শেবাচিম হাসপাতালে জনবল সংকটের কারণে এসব নীতিমালা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।
চিকিৎসক ও নার্সের পাশাপাশি কর্মচারীরও সংকট রয়েছে হাসপাতালে। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ১৬১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮৭ জন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ৪৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত ২০৯ জন। দুই শ্রেণি মিলিয়ে ৫৯৪টি পদের মধ্যে শূন্য ২৯৮টি। এই ঘাটতি সামাল দিতে হাসপাতালে ২২২ জন আউটসোর্সিং কর্মী কাজ করছেন।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, হাসপাতালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী ৫০০টির কিছু বেশি শয্যার রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে। কিন্তু এই জনবল দিয়েই প্রায় তিন হাজার ভর্তি রোগী এবং বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া ওষুধসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করা হয় এক হাজার শয্যার হিসাব অনুযায়ী। ফলে একটি ওয়ার্ডে সাত দিনের জন্য সরবরাহ করা ওষুধ তিন দিনেই শেষ হয়ে যায়। রোগীরা নিয়মিত ওষুধ না পাওয়ার এটিও অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি।
এসব বিষয়ে জানতে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ. কে. এম. মশিউল মুনীমের মোবাইলে ফোন দিলে তিনি ধরেননি।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. মাজহারুল রেজওয়ান সমকালকে বলেন, রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সাম্প্রতিক সভায় শয্যাসংখ্যা দুই হাজারে উন্নীত করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।