স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কৌশল নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করতে চায়, কিন্তু জোটের কয়েকটি শরিক দল চায় জোটবদ্ধভাবে অংশ নিতে। এ নিয়ে সমঝোতা না হলে শরিকদের কেউ কেউ বিকল্প জোটে নির্বাচনের কথা ভাবছে। তাতে ১১ দলীয় ঐক্যে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জোটের কয়েকটি শরিক দলের যুক্তি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার পর স্থানীয় নির্বাচনে সমন্বয় করা না হলে ঐক্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যাবে।
জামায়াত ও শরিক দলগুলোর একাধিক নেতা সমকালকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে জোটের প্রশ্নটি শুধু প্রার্থী সমন্বয়ের নয়; এর সঙ্গে শরিক দলগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী অবস্থানও জড়িত।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি রাজনৈতিক দল ‘সমমনা ইসলামী দলসমূহ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি রয়েছে। তবে নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া দলগুলো পুরোনো জোট ছাড়বে কিনা, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কোনো কোনো দল দুই প্ল্যাটফর্মেই থাকার পক্ষে।
গত ২২ অক্টোবর হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে সাত দলের বৈঠকে নতুন প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন রয়েছে। দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে ২১ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠকে প্ল্যাটফর্মের কাঠামো ও কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন সমকালকে বলেছেন, কওমি ধারার সাতটি দল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে ১১ দলীয় ঐক্য ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।
কেন একক নির্বাচন চায় জামায়াত
জামায়াতের নেতাদের বক্তব্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো নয়। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে বিপুলসংখ্যক পদে প্রার্থী বাছাই এবং সমঝোতা করা কঠিন। তা ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক শক্তি ও আঞ্চলিক হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে আসন ভাগাভাগি না করে স্থানীয় নেতৃত্বের ভিত্তিতে নির্বাচন করতে চায় দলটি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে জোট করার সিদ্ধান্ত নেই। তবে কোনো জেলা, উপজেলা বা এলাকায় শরিক দলগুলো নিজেরা আলোচনা করে একক প্রার্থী ঠিক করলে কেন্দ্র থেকে বাধা দেওয়া হবে না।
জামায়াত নেতারা আরও বলছেন, অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকার সময়ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে আসন ভাগাভাগি হয়নি। ২০১৪ সালের উপজেলা ও ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনে কোথাও বিএনপি জামায়াতকে, কোথাও জামায়াত বিএনপিকে ছাড় দিয়েছিল। সেসব সমঝোতা হয়েছিল স্থানীয় পর্যায়ে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির একজন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিকদের আসন ছেড়ে দিতে গিয়ে জামায়াতের কয়েকটি আসনে সম্ভাবনাময় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া যায়নি। অন্তত তিনটি আসনে স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, স্থানীয় নির্বাচনে আবারও শরিকদের জন্য ছাড় দিতে গেলে দলের সাংগঠনিক অসন্তোষ বাড়তে পারে। যেসব নেতাকর্মী দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের সুযোগ দিতে চায় জামায়াত।
দলটির এই অবস্থানের পেছনে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের হিসাবও রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে জোটের আসন সমঝোতার কারণে কোন এলাকায় জামায়াতের প্রকৃত জনসমর্থন কতটা, তা নির্ণয়ের সুযোগ সীমিত ছিল। স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিলে সেই চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন নেতারা।
শরিকদের অসন্তোষ কেন
১১ দলীয় ঐক্যের কয়েকটি শরিক দলের নেতারা মনে করছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও তারা জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলন করছেন। অথচ স্থানীয় নির্বাচনে জোটগত সমঝোতা না হলে তাদের সাংগঠনিক ও নির্বাচনী লাভের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।
একাধিক শরিক দলের নেতার বক্তব্য, জাতীয় নির্বাচনে যেসব আসনে তাদের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, স্থানীয় নির্বাচনেও সেসব এলাকায় দলীয় প্রার্থীদের সমর্থন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে তৃণমূলে দলগুলোর ভিত্তি তৈরি হবে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করলে শরিকদের জন্য সেই সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
শরিকদের একাংশের অসন্তোষের পেছনে আদর্শিক ও রাজনৈতিক দূরত্বও রয়েছে। কওমি ধারার দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের মতাদর্শগত পার্থক্য দীর্ঘদিনের। এর পরও জাতীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তারা একসঙ্গে ছিল। শরিক নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, এই সহযোগিতার সুফল জামায়াত তুলনামূলকভাবে বেশি পাচ্ছে।
তবে সব শরিক দল যে বিকল্প জোটে যেতে চায়, তা নয়। বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান সমকালকে বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে তাদের সঙ্গে জামায়াতের সমন্বয় রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভায় লেবার পার্টির ভালো প্রার্থী থাকলে স্থানীয় জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা করে সমঝোতা করা হবে।
হেফাজতের উদ্যোগে বিকল্প মেরূকরণ
জামায়াতের সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনে সমঝোতা না হলে কওমি ধারার দলগুলো নিজেদের মধ্যে নির্বাচনী বোঝাপড়া গড়ে তুলতে পারে। হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সাত দলের নতুন প্ল্যাটফর্ম সেই সম্ভাবনা সামনে এনেছে।
জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর মতবাদের বিরোধিতা কওমি ধারার ধর্মীয় পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিনের। ফলে হেফাজতের মধ্যস্থতায় দেওবন্দি আদর্শের অনুসারী দলগুলোর এক মঞ্চে আসাকে শুধু নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট নেতারা; এর সঙ্গে আদর্শিক বলয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ও জড়িত।
তবে নতুন প্ল্যাটফর্মের দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে রয়েছে। অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতায় যায়নি। ফলে সাত দলের অভিন্ন নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে পুরোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক বড় বিবেচনা হয়ে উঠতে পারে।
জামায়াত নেতারা অবশ্য এ উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তাদের কারও কারও ধারণা, স্থানীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থি ভোট ভাগ করতেই বিএনপির স্বার্থে বিকল্প মেরূকরণ তৈরি করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
এনসিপির অবস্থান
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেবে বলে জানিয়েছে। নেতারা জানান, শতাধিক উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে যোগ্য প্রার্থীর সংকট রয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কৌশল বিবেচনায় ভবিষ্যতে কিছু স্তরে সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন সমকালকে বলেন, দলের সমর্থিত প্রার্থীরা এককভাবে নির্বাচন করবেন। সিটি করপোরেশনের প্রার্থিতা ঘোষণা করা হয়েছে এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থী বাছাই চলছে।
এনসিপি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে এবং উত্তরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণে জামায়াতের প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি আবু সাদিক কায়েম। উত্তরে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
এ দুই দলের আলাদা প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থানীয় নির্বাচনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে নির্বাচন যত এগোবে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী সমঝোতার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
জামায়াত শেষমেশ কী করবে
স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে এগোনোর বিষয়ে জামায়াতের চূড়ান্ত কৌশল নির্ধারণে বিএনপি সরকারের অধীনে নির্বাচনের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দলটির নেতারা বলছেন, নির্বাচন কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, তা দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে। তাদের মতে, নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিরোধী দলগুলোর সমন্বিত অবস্থানের প্রয়োজন বাড়তে পারে।
জামায়াত নেতারা ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচনকে এ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের মূল্যায়নে নির্বাচন সুষ্ঠু হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে এগোনো সহজ হবে। অন্যদিকে অনিয়ম বা পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সর্বস্তরে একই কৌশল কার্যকর হবে কিনা, তা নিয়ে জামায়াতের মধ্যেও আলোচনা রয়েছে। দলটি সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে জোট না করার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার সুযোগ খোলা রাখছে তারা।