যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতীক গাধা আর রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হাতি। নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কার্টুন, পোস্টার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা মেলে এই দুই প্রাণীর ছবি। তবে অনেকেরই অজানা, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রাণী দুটি জড়িয়ে গেল।
ইতিহাস বলছে, এই প্রতীকগুলোর প্রচলন শুরু হয়েছিল ১৮০০ শতকে। আর এগুলো জনপ্রিয় করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বিখ্যাত রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট থমাস নাস্ট। তিনি অবশ্য প্রাণী দুটির প্রতীকী ব্যবহার শুরু করেননি; বরং নিজের কার্টুনের মাধ্যমে সেগুলোকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
ডেমোক্র্যাটদের গাধা প্রতীক যেভাবে এলো
যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের হাত ধরে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে গাধার সম্পর্কের সূচনা। ১৮২৯ থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিরোধীরা জ্যাকসনকে ব্যঙ্গ করে ‘জ্যাকঅ্যাস’ বা গাধা বলে ডাকতেন। তবে জ্যাকসন অপমানজনক এই উপাধিকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে বরং নিজের প্রচারণায় কাজে লাগান। নির্বাচনী পোস্টারেও গাধার ছবি ব্যবহার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে গাধার সম্পর্ক কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে। তবে ১৮৭০-এর দশকে কার্টুনিস্ট থমাস নাস্ট তার রাজনৈতিক কার্টুনে গাধার প্রতীক ব্যবহার শুরু করলে এটি আবার জনপ্রিয়তা পায়।
রিপাবলিকানদের প্রতীক হাতির ইতিহাস
রিপাবলিকান পার্টির হাতি প্রতীকের ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের ইউনিয়ন বাহিনীর সৈন্যরা ‘সিয়িং দ্য এলিফ্যান্ট’ বা ‘হাতি দেখা’ কথাটি ব্যবহার করতেন। এর মাধ্যমে যুদ্ধে অংশ নেওয়া বা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনের বিষয়টি বোঝানো হতো।
১৮৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের পুনর্নির্বাচনী প্রচারণার একটি লিফলেটেও হাতির ছবি দেখা যায়। ধারণা করা হয়, সেখান থেকেই রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে হাতির প্রতীকের সম্পর্ক আরও জোরালো হয়।
পরে থমাস নাস্ট তার কার্টুনে হাতিকে রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। ধীরে ধীরে এটি দলটির স্থায়ী পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
নীল গাধা, লাল হাতি যেভাবে পরিচিতি পেল
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দল দুটির পরিচয় এখন শুধু প্রাণীর প্রতীকে সীমাবদ্ধ নয়, রঙের মাধ্যমেও আলাদা করা হয়। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতীক নীল রঙের গাধা, আর রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক লাল রঙের হাতি।
তবে এই রঙের ব্যবহার প্রতীক দুটির মতো এত পুরোনো নয়। ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমগুলো নির্বাচনী ফলাফল দেখাতে ডেমোক্র্যাটদের জন্য নীল এবং রিপাবলিকানদের জন্য লাল রঙ ব্যবহার করে। পরবর্তী সময়ে এই রঙের বিভাজন ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী মানচিত্র ও রাজনৈতিক আলোচনায় নীল বলতে ডেমোক্র্যাট এবং লাল বলতে রিপাবলিকানদের বোঝানো হয়।
প্রতীক জনপ্রিয় করেন থমাস নাস্ট
থমাস নাস্টকে বলা হয় আধুনিক আমেরিকান রাজনৈতিক কার্টুনের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৮৭০-এর দশকে ‘হারপার্স উইকলি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তার কার্টুনগুলো হাতি ও গাধার প্রতীককে ব্যাপক পরিচিতি দেয়।
শুধু রাজনৈতিক দলের প্রতীক জনপ্রিয় করাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জনমত গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন নাস্ট। ১৮৬৪ থেকে ১৮৮৪ সালের মধ্যে ছয়টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে তার কার্টুন ও ব্যঙ্গচিত্র আলোচনায় ছিল। এ কারণে তাকে ‘প্রেসিডেন্ট মেকার’ বলেও অভিহিত করা হতো।
প্রতীক বদলানোর উদ্যোগও ছিল
সময়ের সঙ্গে হাতি ও গাধা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির পরিচিত প্রতীকে পরিণত হলেও এগুলো নিয়ে বিতর্ক বা পরিবর্তনের চিন্তা একেবারে ছিল না, এমন নয়।
১৯৮৫ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাদের দাপ্তরিক লেটারহেডের নকশা পরিবর্তনের সময় গাধার প্রতীক বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। তবে দলের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি টেরি মাইকেল বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, নতুন নকশা খোঁজার উদ্দেশ্য গাধাকে বাদ দেওয়া নয়। এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি।
শেষ পর্যন্ত গাধার প্রতীকটি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে রয়ে যায়। ২০২৪ সালের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনেও বিভিন্ন ছবিতে এর উপস্থিতি দেখা গেছে। দলটির বিভিন্ন প্রচারসামগ্রীতেও রয়েছে গাধার ছবি।
অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচ্ছদ ও দলীয় ওয়েবসাইটেও হাতির প্রতীক ব্যবহার করা হয়।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে হাতি ও গাধা এখন শুধু দুটি প্রাণীর ছবি নয়; বরং দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ ইতিহাস, পরিচয় ও নির্বাচনী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।