একটি পথ, অথচ তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাখো মানুষের ঘরহারা হওয়ার ইতিহাস। সেই পথে ছিল মানুষের মিছিল, ছিল অনিশ্চিত গন্তব্য, ক্ষুধা, ক্লান্তি আর প্রিয়জন হারানোর বেদনা। একাত্তরের সেই শরণার্থীজীবন গতকাল শনিবার বিকেলে ফিরে এলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। কখনও কবিতার পঙ্ক্তিতে, কখনও গানের সুরে, কখনও প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিতে; আর জাদুঘরের বাইরে ক্যানভাসে।
স্মৃতি’৭১ আয়োজিত ‘৭১-এর শরণার্থী জীবন’ ও ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শীর্ষক স্মারক অনুষ্ঠানে একাত্তরের শরণার্থী সংকটের মানবিক আখ্যানই নানা শিল্পমাধ্যমে তুলে ধরা হয়। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জিন্নাত আরা হক। একাত্তরের শরণার্থী সংকট এবং মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ফারুক এইচ খান। ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া মানুষের বিপর্যয় কীভাবে গিন্সবার্গের কবিতায় বিশ্বজনীন ভাষা পেয়েছিল, উঠে আসে তাঁর কথায়।
এরপর মঞ্চে উচ্চারিত হয় ১৫২ লাইনের কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর নির্বাচিত অংশ। আবৃত্তি করেন মুস্তাক আহমেদ ও নাজনিন পাপ্পু। কবিতাকে কেন্দ্র করে মৌসুমী ভৌমিকের গাওয়া বহুল পরিচিত গানটি পরিবেশন করেন নবনিতা হাবিব চৌধুরী। পর্দায় তখন একাত্তরের আরেক বাস্তবতা। প্রদর্শিত হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘একাত্তরের শরণার্থী’। তবে পর্দার সেই ইতিহাসের পরই মঞ্চে উঠে আসে মানুষের নিজের স্মৃতি। যে স্মৃতির ভেতর যুদ্ধ কখনও কোনো সাল-তারিখ নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া মুখ, বিচ্ছিন্ন পরিবার কিংবা অনিশ্চিত এক যাত্রার নাম।
সেই ব্যক্তিগত স্মৃতির সবচেয়ে বেদনাময় অধ্যায়টি উঠে আসে আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়। ভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল জুগিয়েছিলেন যেসব শিল্পী, তাঁদের মঞ্চে নিয়ে আসেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, লেখক ও প্রকাশক মফিদুল হক বলেন, একাত্তরের শরণার্থী অভিজ্ঞতাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দলিল হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
যুদ্ধদিনের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের স্মৃতিও ভাগ করে নেন কণ্ঠশিল্পী শাহীন সামাদ। শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন শঙ্কর লাল সাহা ও মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ ফারাজিও। তাঁদের স্মৃতিচারণে ফিরে আসে দেশ ছাড়ার যাত্রা, আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই।
মিলনায়তনের ভেতরে যখন কথায়, কবিতায় ও গানে ফিরে আসছিল একাত্তর, বাইরে তখন ক্যানভাসে সেই ইতিহাসের অন্য ভাষ্য নির্মাণ করছিলেন দেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীরা। তাঁদের তুলিতে উঠে আসে শরণার্থী জীবনের নানা খণ্ডচিত্র-যুদ্ধ, দেশত্যাগ, পথের ক্লান্তি, আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।