প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা দীর্ঘদিনের। তাই এক দিন, এক মাস কিংবা ছয় মাসে এসবের সমাধান সম্ভব নয়। সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে কাজ করছে। আগামী ২, ৩, ৫ বা ১০ বছরে নেওয়া উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা নজরদারি করতে হবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘নাগরিক প্ল্যাটফর্ম সংলাপ: সরকার কতখানি এগোলো? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ সংলাপ সঞ্চালনা করেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে এবং শেখার ফলাফলে কী পরিবর্তন আসছে, সেটিই সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসবের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ভবন ও সরঞ্জামের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর শেখার ফলকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। পিইডিপির দীর্ঘদিনের প্রকল্পকেন্দ্রিক কাঠামোয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব ধরনের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান মনিটরিংয়ে
সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে দেশের সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে কার্যকর মনিটরিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধারার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের বলে মন্তব্য করেন তিনি। ২০২৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধারার প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন কারিকুলাম ও সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান। আগামী বছর থেকে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানান ববি হাজ্জাজ।
পিইডিপি-৫ নিয়ে সিপিডির উদ্বেগ
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে প্রাথমিক শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট ২৪টি উদ্যোগের কোনোটিই এখনও পুরোপুরি কার্যকর পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কোনোটি প্রস্তাবিত, কিছু বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে এবং কিছু নীতি ও আইনগত প্রক্রিয়াধীন।
সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, এ পর্যন্ত পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদিত হয়নি। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত অনুমোদনের পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি।
রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর দাবি
ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা প্রাথমিক শিক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিদ্যালয় নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে প্রশাসনের স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর অভিভাবকদের নির্ভরতা কমবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধারার প্রাথমিক শিক্ষাকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাব দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান প্রাথমিক পর্যায়েই শিশুদের পাঠাভ্যাস ও মৌলিক দক্ষতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নুসরাত তাবাসসুম বলেন, ভর্তি, বই বা ইউনিফর্ম বিতরণের হিসাব দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি মাপা উচিত নয়।
শিক্ষকরা যাতে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন, সে জন্য ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক তাসনিম জারা। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের নিশাত সুলতানা নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের মূলধারার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। টিচ ফর বাংলাদেশের সিইও মুনিয়া মজুমদার বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি শক্তিশালী করে সচেতন অভিভাবকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন, ক্যারিয়ার ও পেশাগত মর্যাদা উন্নয়নে কাজ চলছে। শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে মাঠের সংকট সমাধানে কাছাকাছি বিদ্যালয়ের মাঠ যৌথভাবে ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।